Romantic Love Story in Bangla - রোমান্টিক প্রেমের গল্প

আজকের গল্প টির নাম - "রোমান্স" গল্পের প্রধান চরিত্রে রমেন ও বীনা, বিষয় - রোমান্টিক ভালোবাসা, আরও love story in bangla পড়ার জন্য আমাদের ব্লগ টিকে সাবস্ক্রাইব করতে পারেন। আমাদের এই ব্লগ টিতে আপনি আরও পাবেন Bangla love story  এবং love story in bangla এবং bangla premer golpo অথবা bangla jokes গল্প গুলি পড়িয়া যদি আপনার ভালো লাগিয়া থাকে তাহলে শেয়ার এবং অবশ্যই কমেন্ট করিয়া জানাইতে ভুলিবেন না। 


love story in bangla

Love Story in Bangla Language - রোমান্স একটি প্রেমের গল্প


আজকের গল্প - রোমান্স 

সমীরই প্রথম কথাটা তুললে।
তার মত এই যে Romance prem ওসব নভেলিয়ানা কেবল Novel এই ঘটে, বাস্তব জীবনে ওদের অস্তিত্ব নেই। তাতে সুধীরও যােগ দিল বলে মনে হল। ক্রমে ক্রমে বাকি সবাই সমীরের মতেই মত দিল। 
তারপর ক্লাবের বেয়ারা চা দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে আমাদের গল্পের ধারা শীঘ্রই এসে টেনিসে পৌছলাে অন্য সব দিনের মতাে। ঘরের কোণে ব্রিজ টেবিলের আড়ালে রমেনবাবু এতক্ষণ আলােয়ান মুড়ি দিয়ে আরামকেদারায় টান হয়ে শুয়েছিলেন। 
এতক্ষণ পর্যন্ত কোনাে তর্কেই তিনি যােগ দেননি, বিশেষ কোনাে কথাও বলেননি। চায়ের এক চুমুক খেয়েই একটু তাজা হয়ে নিয়ে বললেন-দেখাে তােমরা এতক্ষণ বকে যাচ্ছিলে আমি শুনছিলাম, কথা কইনি বটে কিন্তু যখন কথাটা উঠেছে তখন বলি শােনাে। 
রােমান্স আছে এবং খুবই আছে। জীবনটাই তাে একটা প্রকাণ্ড Romance হে - সে চোখে দেখে ক’জন দেখবার চোখই বা আছে ক’জনের? আচ্ছা, চা-টা জুড়িয়ে যাচ্ছে, এসাে খেয়ে নেওয়া যাক শােনাে তারপর বলি... রমেনবাবু আমাদের ক্লাবের নতুন মেম্বর, মাস চারেক হল যােগ দিয়েছেন। তাকে একটু অদ্ভুত ধরনের লােক বলে আমাদের সকলেরই মনে হয়েছে। ব্রিজ, টেনিস, বিলিয়ার্ড, দাবা কোনাে খেলাতেই কোনােদিন তিনি যােগ দেন নি। খুব বেশি মেশামেশি বা গল্পও কখনাে তাকে করতে দেখা যায় না। আপন মনে এসে বসেন, কাগজপত্র পড়েন, সন্ধ্যার আগেই উঠে চলে যান। কিন্তু লােকটির মধ্যে এমন একটা জিনিস আছে। যাতে ক্লাবের সকলে তাকে খুব পছন্দ করে। তিনি না এলে, কেন তিনি এলেন না সে সম্বন্ধে আলােচনা হয় এবং তার একটা জিনিস, যা আদৌ ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক নয়, সেটা এই যে তিনি উঠে চলে গেলে তার পেছনে তার সম্বন্ধে মন্দ কথা কেউ কোনােদিন বলত না। ইতিমধ্যে চা খাওয়া শেষ হয়ে গেছলাে। 
রমেনবাবু চা পান শেষ করে রুমালে মুখ মুছে গল্প শুরু করলেন- বছর কয়েক আগে আমি তখন একটা স্বদেশী Bank এর Share বিক্রি ও প্রচারের কার্যে Dhaka যাই। সেই প্রথম ও-অঞ্চলে যাওয়া। সময়টা শীতের শেষ হলেও কলকাতার ধারণায় আমি শীতের কাপড় সঙ্গে নিয়ে যাইনি বলে একদফা পদ্মার ওপর স্টীমারে, তারপর ট্রেনে শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে রাত সাড়ে নটা দশটার সময় গিয়ে ঢাকায় পৌছলাম। আমাদের Bank এর একজন Director, Dhaka শহরের এক ভদ্রলােকের নামে একখানা পরিচয়পত্র দিয়েছিলেন। তিনি শহরের একজন বড়ো Lawyer - নাম এখানে করবার আবশ্যক নেই তারই বাসায় গিয়ে উঠব এরকম কথা ছিল। আমি যখন সে বাড়ি গিয়ে পৌছলাম তখন রাত সাড়ে দশটার কম নয়। বেশ জ্যোৎস্না রাত, কম্পাউন্ডের বাঁ ধারে ছােট্ট ফুলবাগান, জাফরিতে মাধবীলতা এঁকেবেঁকে উঠেছে আলাে-আঁধারে পাতার আড়ালে বড়াে বড়াে ব্ল্যাকপ্রিন্স গােলাপ ফুটে রয়েছে এসব গাড়িতে বসেই কৌতুহলের সঙ্গে চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। গাড়ি থামতেই একজন হিন্দুস্থানী দরােয়ান রুটি সেঁকা ফেলে গাড়ির কাছে এসে সেলাম করে দাঁড়াল। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম উকিলবাবু কি কাজে কুমিল্লাতে গেছেন, আজ তিন-চার দিন বাড়ি ছাড়া, কবে আসবেন তার ঠিক নেই। কোচম্যানকে গাড়ি ফেরাতে বলেছি ডাক বাংলােতেই অগত্যা উঠব একটি ছেলে বাড়ির মধ্যে থেকে বার হয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে সেই দরােয়ানটিও এল সে যে ইতিমধ্যে কখন বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিল আমি লক্ষ্য করিনি। ছেলেটি বললে, “বাবা কাল সকালেই আসবেন, আপনি যাবেন না শুনলে বাবা দুঃখ করবেন। রামদীন, বাবুর জিনিসপত্র নামিয়ে নাও। সুতরাং রয়ে গেলাম। আহার ও শয়নের ব্যবস্থা সুন্দর হল, সারা-দিনের পরিশ্রমে শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে উঠে বাইরের বারান্দাতে বসে কাগজ পড়ছি, গৃহস্বামীর গাড়ি সদর গেট দিয়ে কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকলাে। আজ সকালের ট্রেনেই উকিল-বাবুর আসবার কথা ছিল তাই তার গাড়ি স্টেশনে গিয়েছিল তাঁকে আনতে। গৃহস্বামী গাড়ি থেকে নেমে আমার দেখে আমার পরিচয় জেনে খুব খুশি হলেন। নানাভাবে আপ্যায়িত করলেন, রাত্রে কোনাে কষ্ট হয়েছে কিনা সেকথা অন্ততঃ দশবার এমন ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন যে মনে হল রাত্রে কষ্ট হয়নি বললে তাকে হতাশ করা হবে। একদিনের মধ্যে আমি যেন বাড়ির মধ্যে দাওয়ায়। পরদিন সকালে আমার বাইরের ঘরে একটি বারাে-তেরাে বছরের সুন্দরী মেয়ে চা ও খাবার নিয়ে এল। বেশ ডাগর ডাগর চোখ, কালাে চুলের রাশ পিঠের ওপর পড়েছে, মুখ থেকে বুদ্ধিমতী মনে হয়। 
চা ও খাবারের পাত্রটা টেবিলের ওপর রেখে সে চলে যাচ্ছিল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম তুমি বুঝি খুকী এ বাড়িরই না? নাম কি তােমার?
সে হেসে বললে-বীণা।
তারপরই সে চলে গেল, পরের দিন সকালে সেই মেয়েটিই আবার চা নিয়ে এল। এ-দিন সে অত শীঘ্র চলে গেল না। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি বুঝি স্কুলে পড়ােনা ? সে বললে আমি মিডফোর্ড গার্লস স্কুলে পড়ি। কোন ক্লাসে পড়াে? এবারে ফোর্থ ক্লাসে উঠেছি এই জানুয়ারি মাসে কি কি বই পড়াে? কিছুক্ষণ ধরে আমাদের কথাবার্তার ধারা ওই পথ ধরেই বেয়ে চললাে। বিকালে সে আপনিই আবার এল। আমার ঘরের চেয়ারটার হাতলের ওপরে বসলাে।

আরও পড়ুনঃ Bengali Funny Jokes

বললে আপনি বুঝি বই লেখেন?
কি করে জানলে বলাে দেখি?
আপনার নাম দেখেছি, আমাদের বাড়িতে মাসিকপত্র আসে, তাতে আছে কই, কোন্ মাসিক পত্র, আননা তাে দেখি।
বীণা দু-তিনখানা মাসিকপত্র নিয়ে এল।
একখানাতে আমার বিদেশী ব্যাঙ্ক ও আমাদের কর্তব্য” বলে একটা অর্থনৈতিক প্রবন্ধ বার হয়েছিল বটে, সেইটা বীণা খানিকক্ষণ ধরে পড়লাে। তারপর সেটা মুড়ে রেখে এ-গল্প ও-গল্প করতে লাগলাে। আমি তাকে মুখে মুখে ট্রানশ্লেসান্ জিজ্ঞাসা করলাম সবগুলাের উত্তর দিলে। ঢাকা মিউজিয়াম দেখতে যাবার ইচ্ছা ছিল। বিকালটায় কিন্তু বীণা অনেকক্ষণ ধরে ঘরে বসে রইলাে মিউজিয়াম দেখতে না যাওয়া হলেও কোনাে ক্ষতি অনুভব করলাম না। শেষরাতে কি জন্যে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, কানে গেল বাড়ির মধ্যে মেয়েলী গলায় কে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ইউক্লিডের জিয়ােমেট্রি পড়ছে Two tangents can be drawn to a circle from an external point and they are equal and also subtend  ভারী আশ্চর্য লাগলাে। বীণা নিশ্চয়ই নয় কারণ ফোর্থ ক্লাসে জিয়ােমেট্রির ট্যানজেন্ট কোনাে স্কুলেই পড়ানাে হয় না—তা ছাড়া সেটা বীণার গলাও নয়। ঘড়িতে দেখলাম রাত চারটা বেজেছে। মনে মনে ইউক্লিডের অপূর্ব প্রভাবকে ধন্যবাদ না দিয়ে থাকতে পারলাম না। এই শীতের রাত্রে চারটের সময় কার জ্ঞান-পিপাসা এত প্রবল হয়ে উঠেছে। জানবার ভারী ইচ্ছে হল। সকালে বীণা চা নিয়ে আসতেই জিজ্ঞাসা করলাম-বীণা শেষরাত্রে কে জিয়ােমেট্রি পড়ছিল বাড়ির মধ্যে তুমি?
বীণা হেসে বললে আমি না, ও দিদি এইবার ম্যাট্রিক দেবে। এই সামনের বুধবার থেকে একজামিন বসবে কিনা? আমি বললাম কই, তােমার দিদি ম্যাট্রিক দিচ্ছেন সে-কথা তাে শুনিনি? স্কুলের গাড়িতে তাে তুমিই একলা যাও দেখেছি বীণা হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কি। বললে বা রে, বেশ লােক তাে আপনি। দিদি তাে অ্যালাউ হয়ে বাড়ি বসে পড়ছে ও বুঝি আমার সঙ্গে রােজ রােজ স্কুলের গাড়িতে পড়তে যাবে?
কথাটা বীণা ঠিকই বলেছে, তার হাসিটা নিতান্ত অসঙ্গত নয় বটে। সেদিন বিকালে স্কুলের গাড়িটা যখন এসে লাগলাে তখন আমি রােয়াকে পায়চারি করছিলাম। বীণাকে নামতে দেখলাম না, কিন্তু আর একটি মেয়ে নামলাে। বয়স পনেরাে-ষােলাে হবে, অপূর্ব সুন্দরী, লাল পাড় সিল্কের জ্যাকেটের বাইরে নিটোল শুভ্র বাহুদুটি যেন হাতীর দাঁতে কুঁদে তৈরি। একবার আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে চেয়ে দেখে শান্ত গতিতে বাড়ির মধ্যে ঢুকলাে। সন্ধ্যার একটু আগে বীণা এসে বললে চা এখন আনবাে, না বেড়িয়ে এসে খাবেন? পরে একটু থেমে বললে দিদিকে আজ দেখেছেন, না? আমি তখনও ঠিক করতে পারিনি যে স্কুলের গাড়ির সেই মেয়েটিই বীণার দিদি। পূর্বেই বলেছি বীণা ভারী বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে আমার মুখ দেখেই ব্যাপার বুঝে নিয়ে বললে আজ বিকেলে স্কুলের গাড়ি থেকে যে নামলাে তখন ঐ দিদি-আমি তাে আজ স্কুলে যাইনি। দিদি রিসিট আনতে স্কুলে গিয়েছিল যে ও-বেলা পরে সে বললে দিদিই আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, বাইরের ঘরে ও ভদ্রলােকটি মনে মনে অভিমানে বড়াে ঘা লাগলাে, বড়াে-মানুষের মেয়ে বটে, সুন্দরীও বটে, কিন্তু আজ ছ-সাতদিন যে আমি তার বাপের বৈঠকখানার একখানা চেয়ার টেবিলের মতাে বাইরের ঘরের এক কোণে পড়ে আছি, এতদিনের মধ্যে এ হতভাগ্যের সম্বন্ধে সে সংবাদটুকুও কি তার কর্ণগােচর হয়নি? দিন দুই কেটে গেল। এ কয়দিনে আমি নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যথেষ্ট ঘােরাঘুরি করলাম, তাতে ঠিক সময়ে স্নানাহার হয়ে উঠতাে না কোনােদিনও। সুতরাং বীণার সঙ্গে দেখা হবার সময় হত না। তৃতীয় দিন সকালে বার হয়ে সন্ধ্যার কিছু আগে ফিরে এলাম। বারান্দাটাতে বসে একটু বিশ্রাম করছি, অপ্রত্যাশিত ভাবে বীণা ঘরে ঢুকে হাসি-মুখে বললে ঠাকুর দু-বার, তারপর আমি দু-বার আপনাকে ডাকতে এসে ফিরে গিয়েছি আপনার খিদে-তেষ্টা কিছুই পায় না? কোথায় ছিলেন সারা দিনটা? আমি কৈফিয়ৎ দেবার আগেই সে আবার বলে উঠলাে মুখ হাত ধুয়ে ফেলুন, আপনার চা নিয়ে আসি বাবা এখনও কাছারী থেকে ফেরেননি, গরম জল চড়ানােই আছে... অল্প পরেই সে চা নিয়ে এসে অভ্যস্ত ভাবে সামনের চেয়ারের হাতলটার ওপর বসে অনর্গল বকে যেতে লাগলাে সব কথার উত্তর পাবারও প্রত্যাশা সে রাখে না। আপনা আপনিই বেশ বলে যেতে পারে। বললে ভারী মজা হয়েছে, আমি আপনার একটা লেখা দিদিকে দেখিয়ে বললুম–পড়ে দেখাে তাে। দিদি পড়তে গিয়ে বুঝতে পারে না- দাঁড়ান সেখানা আনি আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে বাড়ির মধ্যে চলে গেল, কিন্তু সেদিন আর সে বাইরের ঘরে দেখা দিলে না। বীণার খামখেয়ালি ধরন আমার জানা ছিল কাজেই এতে আমি কিছুমাত্র আশ্চর্য হলাম না। পরদিন সকালে সে এল-হাতে একখানা ‘বঙ্গ-বন্ধু। আমায় দেখিয়ে বললে এই নিন দিন দিকি বুঝিয়ে? লাল পেন্সিলে দিদি দাগ দিয়েছে জায়গাগুলাে। সেই মাসের ‘বঙ্গ-বন্ধু’তে আমার “যৌথ-ব্যাঙ্ক ও মধ্যবিত্তের কর্তব্য” বলে প্রবন্ধটা বেরিয়ে ছিল। হাতে নিয়ে মনে মনে ভাবলাম যদি ম্যাট্রিক ক্লাসের একটি মেয়েকেও তাক লাগিয়ে না দিতে পারলাম তবে অনবরত দিন পনেরাে ধরে Imperial Library যাতায়াত এবং নানা Year Book নাড়া-চাড়া করবার সার্থকতা আর কি হল? বীণা বিকেল বেলা একখানা খাতা হাতে নিয়ে এসে বললে চা-টা খেয়ে নিন নিয়ে দিদির এই ট্রানশ্লেসানটা হয়েছে কিনা দেখে দিন তাে। দিদি বললে আপনাকে দেখাতে সেটা হাতে নিয়ে দেখলাম বেশ গােটা গােটা মুক্তোর ছাঁদের লেখাটা বটে, কিন্তু ট্রানশ্লেসানটা বিশেষ উঁচুদরের নয়। কাজেই যখন বীণা বললে ধরুন, কুড়ি নম্বর আছে, কত নম্বর দেবেন আপনি? তখন একটু আমতা আমতা করে বললাম নম্বর? তা এই ধরাে, অবিশ্যি বাংলাটা খুব শক্ত, তা ধরাে এই চার কি পাঁচ দিতে পারি মােটে? তবেই হয়েছে, দিদি তাহলে এবার ইংরাজিতে ফেল, ফেলতুঃ, ফেলুঃ কথাটা শেষ করেই সে মুখে হাতখানা চাপা দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলাে। আমি একটু অপ্রতিভ হয়ে বললাম না না ফেল কেন হবেন আর একটা সােজা দেখে করলেই এটা বেজায় শক্ত কিনা?
বিকেলে এসে বীণা বললে দিদি বলে দিলে আপনাকে রােজ রােজ তার ট্রানশ্লেসান দেখে দিতে হবে পারবেন তাে? খুব খুব নিয়ে এসাে না কাল থেকে। কেন দেখে দেব না?
সেদিন থেকে আমার কাজ হল রােজ রােজ এক রাশ করে ইংরাজি ও বানানের ভুল সংশােধন করা। 
বেশ হাতের লেখাটি কিন্তু খাতার শেষে গােটা গােটা ছাঁদে আমার নেপথ্যপথবর্তিনী ছাত্রীটির নাম লেখা থাকে প্রতিমা দেবী। কয়েকদিন খুব গুমােটের পর বৈকালের দিকে সেদিন খুব বৃষ্টি হল। উকিলবাবুর বাড়ির সামনে একটা বড়াে বটগাছে নতুন পাতা গজিয়েছে, বারান্দাটাতে বসে সেদিকে চেয়ে আমি আমার দেশের বাড়ির কথা ভাবছিলাম কতদিন যাইনি, কাজের খাতিরে বিদেশে বিদেশে বেড়াতে হয়। তবুও যখন নববর্ষা নামে, বৃষ্টি-সজল বাতাসে এখান থেকে তিনশাে মাইল দুরের সে গ্রামখানির ভিজে মাটির গন্ধ যেন ভাসিয়ে আনে মনে হয়, আমার ছােট ভাই অন্তু হয়তাে এতক্ষণ আমাদের উঠানের বৃষ্টির জলে কাগজের নৌকা ভাসিয়ে খেলা করছে,গোঁসাই কাকাদের বৈঠকখানাতে এতক্ষণ তাসের খুব মজলিশ বসেছে তখন মন বড়াে খারাপ হয়ে যায়, ইচ্ছা হয় চাকরি-বাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি গিয়ে উঠি। উকিলবাবু কয়েক দিন রক্তাধিক্যের অসুখ হওয়ার বাড়ির মধ্যেই ছিলেন, কাছারীও যাননি। তিনি ঝড়-বৃষ্টি থামবার পরে বারান্দাতে এসে আমার পাশে একটা আরাম কেদারায় বসে নানা গল্প করতে লাগলেন। বেশ অমায়িক স্বভাবের ভদ্রলােকটি। বললেন ক-দিন আপনার খোঁজ-খবর করতে পারিনি, কোনাে অসুবিধে হয়নি আপনার?
হ্যা দেখুন, বীণা বলছিল আপনি প্রতিমার ট্রানশ্লেসান্ রােজ দেখে দেন কি রকম বুঝছেন, পাস-টাস করবে? ইংরিজিটা তেমন জানে না, যদি কিছু মনে না করেন তবে আপনাকে একটু অনুরােধ করি মেয়েটিকে একটু করে দেখবেন আপনার সময়মতাে? 


শুধু ইংরিজিটা দেখে দিলেই ওর মাস্টার ছিল, হঠাৎ মা মারা যাওয়াতে বেচারী জানুয়ারি মাসে বাড়ি চলে গেল আর এল না অবিশ্যি যদি আপনার বলা বাহুল্য আমাকে এ-বিষয়ে রাজী করাতে তার যতটা বাক্য ব্যয় করার প্রয়ােজন ছিল, তিনি তার চেয়ে যেন একটু বেশিই করলেন। তারপর দিন-দুই কেটে গেল। প্রতিমা রােজ বিকেলে নয় দুপুরে খাতা নিয়ে এসে বসে, সঙ্গে থাকে বীণা, কোনাে কোনাে দিন সেও থাকে না। ধরনটি ওর ভারী মিষ্টি অথচ ওর মধ্যে এমন একটা স্বাভাবিক গাম্ভীর্য আছে যা অবাধ পরিচয়ের পথে একটা সহজ ব্যবধানের সৃষ্টি করে। সেদিন প্রতিমা এসে সামনের চেয়ারখানাতে বসলাে। ট্রানশ্লেসান্ দেবার পরে সে মুখ নিচু করে হেসে বললে এ আমি পারবাে না এটা বদলে দিন আমি বললাম এমন আর শক্ত কি, করে দেখবে এখন সােজা সে পুনরায় ঠিক সেই ভাবে হেসে বললে না আমি পারবাে না, আপনি বদলে দিন যে সুরে সে কথাটা বললে, সেটা অতি শান্ত মৃদু হলেও মনে হল এরপর আর তর্ক চলে না। বদলে দিলাম বটে কিন্তু ভাবলাম মেয়েটি একটু একরােখা ধরনের। পড়াশুনা শেষ করেই প্রতিমা খাতাপত্র উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। একটু পরে বিকেলের দিকে আবার খুব ঝড়-বৃষ্টি নামলাে এ অবস্থায় বাইরে বেড়াতে যাওয়া উচিত হবে না বুঝে চুপ করে বারান্দায় আরাম কেদারাটাতে বসে আছি পেছনে দোর খােলার শব্দ হল। চেয়ে দেখি আগে আগে বীণা, পেছনে প্রতিমা ঘরে ঢুকছে। প্রতিমার আগমন অনেকটা অপ্রত্যাশিত কারণ এক পড়াশােনার সময়টি ছাড়া প্রতিমা অন্য কোনাে সময়ে আমার এখানে আসেনি কখনাে। বীণা ঘরে ঢুকেই বললে কেমন বৃষ্টি নেমেছে মাস্টারমশায়?
এসাে এসাে, ভিজতে ভিজতে এলে যে?
দিদি বললে আপনি একলাটি বসে আছেন তাই চল গিয়ে গল্প প্রতিমা তার দিকে ভ্রূকুটি করে বললে আমি?
পূর্বেও কথাটা মনে হয়েছে এখনও মনে হল, প্রতিমা যে সুন্দরী তার ব্লাউজের হাতার লাল সিল্কের পাড়ের সঙ্গে সুন্দর খাপ খাওয়া শুভ্র বাহু দুটির নিটোল গঠনের দিকে চেয়ে একথা মনে মনে অস্বীকার করতে পারলাম না। কিন্তু সকলের চেয়ে অদ্ভুত তার দুটি চোখ ও ভুরু দুটির একটা বিশেষ ভঙ্গি। সেটা কি তা ঠিক মুখে বােঝানাে যায় না অথচ যে ধরনের সৌন্দর্য মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত অভাবের বেদনা সৃষ্টি করে ওর মুখের সৌন্দর্যটা ঠিক সেই ধরনের। প্রতিমা বললে একলা বসে থাকতে আপনার খুব ভালাে লাগে, না? বসে বসে লেখেন বুঝি। উঃ, কী শক্ত লেখাই লিখেছেন আচ্ছা অত পার্সেন্টেজ, গ্রাফ, সেন্সাস । রিপাের্ট কোথায় পেলেন সব বুঝি আপনার মুখস্থ ?
মুখস্থ কি আর আর থাকে! 
ও-সব লাইব্রেরিতে গিয়ে বই দেখে লেখা অত মুখস্থ থাকলে একটা সচল Year-Book হয়ে উঠবাে যে আচ্ছা আপনার দেশ কোথায়?
অনেক দূর, বর্ধমান জেলায়। তােমার জিয়ােগ্রাফি আছে ম্যাট্রিকে ?
প্রতিমা মৃদু হেসে বললে জিয়ােগ্রাফি না থাকলেও বর্ধমান জেলা জানি বীণা বললে আমাদের ক্লাসের জিয়ােগ্রাফিতে বর্ধমান জেলার কথা আছে। আচ্ছা, আপনাদের দেশে খুব ধান হয় আর খুব কয়লার খনি আছে, না মাস্টারমশায়?
কয়লার খনি নেই এমন নয়, তবে একটু পশ্চিম ঘেঁষে...
প্রতিমা বললে কয়লার খনি দেখেছেন আপনি? আচ্ছা, ও কি করে হয় ?
কয়লার খনির উৎপত্তির কথা এসে পড়াতে স্বভাবতঃই অনেক কথা মনে পড়লাে। পৃথিবীর আদিম জন্মকথা, নেবুলা, স্তর বিভাগ, বিভিন্ন যুগ বিভাগ, সূর্য ও প্রাণীর জন্মের ইতিহাস, জীবাত্মা ও অধুনালুপ্ত অতিকায় জীবদিগের বিবরণ ইত্যাদি। একদিকে প্রতিমার সৌন্দর্য, অন্যদিকে এ-সব মহিমাময় বৈজ্ঞানিক রােমান্স, যেন একদিকে শাশ্বতী নারীর কমনীয়তা, অন্যদিকে পুরুষের বিশাল প্রসারতা ও উদার কল্পনার প্রতীক। প্রতিমা খুব মন দিয়ে শুনছিল এবং মাঝে মাঝে এ-প্রশ্ন ও-প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিল। শেষ হয়ে গেলে বললে আমি এ-সব কথা শুনিনি তাে কোনােদিন স্কুলে কেউ তাে বলে না। ওরা চলে গেল। বাইরে গিয়েই প্রতিমা বীণার দিকে চেয়ে নিচু গলায় শাসনের সুরে বলছে, কানে গেল ও-রকম মাস্টারমশাই মাস্টারমশাই বলছিলি কেন বীণা? ভারী খারাপ শােনাচ্ছিল কানে উনি কি আমাদের মাইনে নিয়ে পড়ান? কয়েক দিন পর হঠাৎ কলকাতায় ফেরবার জরুরী তার পেলাম অফিস থেকে। পরদিন সকালে বিছানাপত্র বাঁধাছাদা চলছে, বীণা এসে বললে আপনার আজ যাওয়া হবে না। 
বেশ তাে আপনি, ভরা অমাবস্যা মাথায় বুঝি বাড়ি থেকে বেরুতে আছে? দিদি বলে দিলে মাস্টার এই রমেনবাবুকে বারণ করে আয়, কাল যাবেন, এখন খুলুন বিছানা-ধরবাে?
সেদিন অমাবস্যা কাটবার কথা ছিল না, সুতরাং বিছানাপত্র আবার খুলতে হল। পরদিন সকালে এক কাণ্ড ঘটলাে, দশটার গাড়িতে আমি চলে যাবাে, উকিলবাবুও আমার সঙ্গে যাবেন তার কি কাজে ফরিদপুরে। নারায়ণগঞ্জ থেকে এক স্টীমারেই আমরা যাবাে। সকালে দুজনে একসঙ্গে মাঝের বারান্দাতে খেতে বসেছি, হঠাৎ উকিলবাবু প্রতিমার ওপর রেগে উঠলেন। আজকের রান্নাবান্নার ভার তারই ওপর বুঝি উকিলবাবু দিয়েছিলেন। সে একটু বেলায় আরম্ভ করিয়েছে ঠাকুরকে দিয়ে, এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিশেষ করে আমি সেখানে একজন বাইরের লােক আমার সামনে মেয়েকে এমন রূঢ় ও অপ্রীতিকর কথাবার্তা বললেন, যাতে করে আমি অত্যন্ত সঙ্কোচ বােধ করলাম। আমার দিকে চেয়ে চেয়ে তিনি বলতে লাগলেন দেখলেন রমেনবাবু, আজকালকার মেয়েদের আমি ওকে কাল রাত থেকে বলছি, সকালে আমরা যাবাে সব যেন ঠিক থাকে দেখেছেন তাে একবার কাণ্ডখানা? বলি এটা কি ঝােল না কি ছাই এটা? এর নাম ঝােল? না, আমি সত্যি বলছি রমেনবাবু, আমি আজকালকার ও-সব বিবি সাজা পছন্দ করিনে একেবারেই। খুব হয়েছে, পড়াশুনাের আর দরকার নেই, যথেষ্ট হয়েছে আমার সামনে এসব কথা হওয়াতে হয়তাে নেপথ্যপথবর্তিনী প্রতিমা লজ্জায় অপমানে ভেঙে পড়তে চাইছিল। কেননা আমি সম্পূর্ণ বাইরের লােক। তিরস্কারের পর সে আর আমাদের সামনে পরিবেশন করতে বেরুলাে না। অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে নিজের ঘরটিতে ফিরে এলাম। একটু পরেই বীণা চায়ের কাপে এক কাপ দুধ নিয়ে এসে বললে, দুধ-মিছরি খেয়ে নিন দুুুধ-মিছরি কেন বলাে দেখি ?
আমাদের বাড়িতে নিয়ম আছে, বাড়ি ছেড়ে কেউ কোথাও যাবার সময়ে তাকে দুধ-মিছরি খেতে দিতে হয়। ওপরের ঘরে বাবাকে দিয়ে এলাম। দিদি বলে দিলে রমেনবাবুকেও দিয়ে আয় বাইরের ঘরে গত তিন দিন প্রতিমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।  আজ এইমাত্র এই যা খাবার সময়ে দেখা হয়েছিল, তাও অতি অল্পক্ষণের জন্যে। যাবার সময়েও দেখা হল না শুধু বীণা বিছানাপত্র গাড়িতে ওঠাবার সময়ে আমার কাছে ছিল। আমার মনে কয়েক দিন ধরে একটা সন্দেহ হয়েছিল, আমি জিজ্ঞাসা করলাম-বীণা, আচ্ছা একটা কথা বলি, তােমার মাকে তাে দেখতে পাইনি কোনােদিন। তিনি আমার মা এক মাস হল মামার বাড়ি গিয়েছেন ছােট-মামার বিয়েতে এই বুধবারে আসবেন। আর দিদির মা নেই, দিদির ছেলেবেলাতেই প্রতিমা তােমার আপন বােন না? বীণা ঘাড় নেড়ে হেসে বললে বা রে, অ্যাদ্দিন আছেন তাও জানেন না বুঝি?
আপনার মন থাকে কোথায়? একদিন তাে আপনার সামনে এ-কথা হয়ে গিয়েছে না?
কবে পূর্বে এ-কথা উত্থাপিত হয়েছিল, মনে না হলেও এতদিনের একটা খটকা আমার কাছে আজ পরিষ্কার হয়ে গেল। তাই বীণা ও প্রতিমার মুখের গড়নে এতখানি তফাৎ! কথাটা অনেকবার মনে হলেও ঠিক কিছু ধারণা করতে পারিনি এতদিন। অত্যন্ত অন্যমনস্কভবে উকিলবাবুর সঙ্গে তাঁর গাড়িতে উঠে বসলাম। আজ কয়দিনের তাে জানাশােনা কিন্তু চলে যাবার সময়ে মনে হতে লাগল, প্রথম এসে এই অপরিচিত লােহার গেটের মধ্যে যখন আমার ঠিকাগাড়ি ঢুকেছিল, সেদিন আজ অনেক দূর পেছনে পড়ে গিয়েছে আজ এই বাড়ির প্রতি জিনিসটা, ঐ পাতাবাহারের গাছটা, বাইরের উঠানের ঐ পুরানাে ইদারাটা, সব যেন হঠাৎ বড়াে প্রিয় হয়ে উঠেছে যেন নীড়হারা বিহঙ্গ নিঃসীম শূন্যে মুক্তপক্ষে উড়তে উড়তে কোথায় নীড়ের সন্ধান পেয়েছিল, যে নীড়ে তার তার কোনাে দাবি-দাওয়া নেই, শুধু মনের মধ্যেকার একটা অনির্দিষ্ট নির্ভরতার ভাবে সেই মিথ্যা অধিকারের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে মাত্র। তাই আজ ছেড়ে যাবার বাস্তবতার সঙ্গে দ্বন্দ্বে তার নিজের কাছে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে যে সে অধিকারের বার্তাটা কতটা অসঙ্গত ও ভিত্তিশূন্য। দেশে ফিরে অল্প কিছুদিন বাড়ি থাকবার পরেই কয়েক মাস একরকম কেটে গেল। পূজার পরে কার্তিক মাসের প্রথমে হঠাৎ অফিসের হুকুম হল আবার ঢাকা যাবার। এবার যখন গােয়ালন্দ থেকে স্টীমারে উঠলাম তখন আগেকার মতাে ভিড় ছিল না। পদ্মাবক্ষ শান্ত স্থির চরে চরে কাশের বন ঘন সবুজ, আকাশের রঙ তিসির ফুলের মতাে নীল। নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ভারী আরামে কাটলাে। ঢাকায় নেমে কিন্তু বীণাদের ওখানে না গিয়ে ডাক বাংলােয় উঠলাম। নানা কারণে এবার বীণাদের বাড়ি উঠতে পারা গেল না। 

আরও পড়ুনঃ Jokes in Bengali

বারবার অনাহূতভাবে তাদের ওখানে গিয়ে উঠলে তারাই বা কি মনে করবে? হয়তাে এবার আমার সেখানে যাওয়াটা তারা পছন্দ নাও করতে পারে। তার চেয়ে বরং নিজের কাজকর্ম সেরে এমনি একদিন তাদের বাড়িতে গিয়ে সকলের সঙ্গে দেখাশুনা করে আসা যাবে এখন। আবার জোৎস্নাপক্ষ ঘুরে এল। ডাক বাংলাের কম্পাউন্ডের হাসুহানা ঝােপের মিঠা মৃদু সৌরভ-ভরা ঝিরঝিরে বাতাসে বারান্দার রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কত কথাই মনে ওঠে। একবার মনে হচ্ছিল, এই অপরিচিত ঢাকা শহরটিতে এমন কেউ আমার আপন জন আছে যে, যদি সে জানে আমি ঢাকাতে এসেছি এবং লক্ষ্মীছাড়ার মতাে ডাক বাংলােয় উঠে দাড়িওয়ালা বাবুর্চির শিরাবহুল হস্তের ডাল-ভাত ও সুরুয়া আহার করছি তাে মনে মনে ভারী দুঃখিত হবে। কারণ আমি জানি আমার আহারের কিছুমাত্র অনিয়ম হলে তার সহ্য হয়নি, নানা অনুযােগ করে ঠিক সময়ে খেতে বাধ্য করেছে, কিসে আমার স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ে তার জন্যে অলক্ষ্যে কত চেষ্টা ছিল তার। এক একবার মনে হচ্ছিল, এসব চিন্তার সার্থকতা কি? অতিথির প্রতি সৌজন্যকে অন্য কিছু বলে মনে করবার অধিকারই বা আমায় কে দিয়েছে? দিন পনেরাে ঢাকায় কেটে গেলেও বীণাদের বাড়ির রাস্তা পর্যন্ত মাড়ালাম না ইচ্ছে করেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুধু ভারতমাতা ব্যাঙ্কের’ শেয়ার বিক্রি এবং কালু-ঝমঝম তােপের পুরাতত্ত্ব আলােচনা করে সময় কাটানাে অসম্ভব ও একঘেয়ে হয়ে উঠল। একদিন বিকেলের দিকে ওদের বাড়িতে ছড়ি হাতে নিশ্চিন্ত মনে বেড়াতে গেলাম যেন এই পথ দিয়েই অন্য কাজের খাতিরে যেতে যেতে একবার দেখতে আসা গেল কে কেমন আছে। গেটের মধ্যে ঢুকে চোখে পড়ল বাড়ির ওপরের ঘরের সব জানালা বন্ধ। উকিলবাবুর অফিস ঘরের সামনে রামধনিয়া বেয়ারাও টুলের ওপর বসে নেই, বাইরে কোথাও একটা...কি করা যায় বা কাকে ডাকব ভাবছি। এমন সময়ে উকিলবাবুর পুরানাে খানসামা ছকু বাজার থেকে কি কিনে নিয়ে গেট দিয়ে বাড়ি ঢুকেই আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
বাবু আপনি?
হ্যা, এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই। বাবু কোথায়?
আপনি শোনেননি, জানেন না কিছু?
পরে সে একে একে যা বলে গেল তা সংক্ষেপে এই যে, গত ভাদ্র মাসে উকিলবাবু রক্তাধিক্য রােগে হঠাৎ হার্টফেল করে মারা যান। তার ওপর আরও বিপদ-বড়াে দিদিমণি পরীক্ষায় ফেল হন এবং তারপরই তার মাথা খারাপ মতাে হয়ে গিয়েছে তিনি আছেন তার মামার বাড়ি। বীণাকে নিয়ে তার মা নিজের বাপের বাড়ি চলে গিয়েছেন এবং সেইখানেই আছেন। বর্তমানে এ-বাড়িতে রঘু মিশির দারোয়ান আর সে ছাড়া আর কেউ থাকে না, অন্য চাকর-বাকরের জবাব হয়ে গিয়েছে। ডাক বাংলােয় ফিরে সেদিন কোনাে কাজে মন গেল না। প্রতিমার কথা ভেবে আমার মন করুণায় পূর্ণ হয়ে গেল। ডাক বাংলাের নির্জন বারান্দার অন্ধকারটাও যেন অশ্রুসজল হয়ে উঠল ওর নানা ছােটখাট কথাবার্তার স্মৃতিতে। পরদিন সকালে আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম যে ব্যাঙ্কের শেয়ার বিক্রির কাজটা যে পরিমাণে হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। সকাল-সন্ধ্যায় সব সময় মহা উৎসাহে ঘুরে ঘুরে অফিসের কাজ করে বেড়াই আর কলকাতার অফিসে বড়াে বড়াে রিপোের্ট পাঠাই। দিন পাঁচেক পরে সেদিন সকালে স্নান করে বসে খবরের কাগজ পড়ছি, এমন সময় ডাক বাংলােয় বেয়ারা বললে, আপকে পাস এক আদমি আনে মাংতা হ্যায়। একটু পরেই দেখি উকিলবাবুর বাসার ছকু খানসামা বেয়ারার সঙ্গে ঘরে ঢুকছে। আমি আগ্রহের সুরে বললাম, কি মনে করে?
ছকু বললে-পরশু ছােটদিদিমণি বাড়ি এসেছেন মার সঙ্গে। আপনি সেদিন বাসায়। গিয়েছিলেন শুনে আমায় বলে দিলেন, ডাক বাংলােয় গিয়ে দেখে আয় তিনি আছেন কি না, থাকলে আমাদের বাড়ি অবিশ্যি করে একবার আসতে বলে আয় আমার নাম করে। আজই বিকেলে যেতে বলে দিয়েছেন। আমি তাকে বলে দিলাম, আপিসের কাজ সেরে বিকেলের দিকে আমি নিশ্চয়ই যাবাে। বিকেলে যখন বীণাদের বাড়ি গেলাম তখন সন্ধ্য হবার খুব বেশি দেরি ছিল না।
রাস্তার ধারে ধারে আলাে দিয়েছে, মােড়ে মােড়ে ফিরিওয়ালা ‘চাই গরম গরম বাখরখানি বলে হেঁকে যাচ্ছে। ওদের বাড়ি পৌঁছে বাড়ির মধ্যে খবর পাঠালাম। একটু পরে বীণা এসে পায়ের ধুলাে নিয়ে প্রণাম করে মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলে, আপনার শরীর ভালাে আছে?
একরকম মন্দ নয়। তােমার তােমাদের সব?
বীণার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল ঝরে পড়ল। কথাটা জিজ্ঞাসা না করাই বােধহয় উচিত ছিল। সান্ত্বনাসূচক গােটা কতক মামুলী কথা বলে আনাড়িরা মতাে বসে রইলাম।
কিন্তু ঐ জন্যেই আমি বীণাকে ভারী পছন্দ করি এত অল্পক্ষণের মধ্যে সে নিজের দুর্বলতাটুকু সামলে নিলে যে তাকে আমি মনে মনে সাধারণ মেয়ের চেয়ে উচ্চ আসনে স্থান না দিয়ে পারলাম না। চোখ মুছে নিয়ে বললে আপনি এসে উঠেছেন কোথায়! ডাক বাংলােয়? আচ্ছা এইবার তাে আমরা এসেছি, জিনিসপত্র নিয়ে এখানে চলে আসুন কাল সকালেই। বীণা কথাটা এমন হুকুমের সুরে বললে যে হঠাৎ তার প্রতিবাদ করা সম্ভবপর নয়। অন্য কথা তুলে সেটা চাপা দেবার ভাবে নানা অনাবশ্যকীয় কথা ওঠালাম, যেন প্রধানতঃ সেইগুলাে জানবার আগ্রহেই আমি এতটা পথ হেঁটে এসেছি। শেষে বললাম প্রতিমা কোথায়? এ প্রশ্নটা অনেকবার মুখে এলেও এতক্ষণের মধ্যে কি জানি কেন একবারও মুখ ফুটে জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারিনি। বীণা বললে, দিদি এখনও সারেনি। বড়াে-মামাবাবু সঙ্গে করে তাকে চুনার নিয়ে গেছেন, সেইখানেই আছে। কেবল আপন মনে বসে বসে কি ভাবে, এছাড়া তার আর কোনাে খারাপ লক্ষণ নেই। কিন্তু খায় না দায় না, শুতেও চায় না, বেড়াতে যেতেও চায় কেবল রাতদিন বসে বসে ভাবছে ঐ তার রােগ পরীক্ষায় পাস না করেই বােধহয় এমন হয়ে বীণা বললে, শুধু পরীক্ষায় পাস নয়, সে অনেক কথা। আপনাকে বলতে আর কি আপনি ঘরের লােক। দিদি পরীক্ষা দেওয়ার পর বাবা তার এক সম্বন্ধ ঠিক করলেন। চাটগাঁয়ের উকিল, হাতে পয়সা আছে, কিন্তু তেজ পক্ষের বর, বয়স চল্লিশেরও ওপর। দিদি সব শুনেছিল, কিন্তু কিছু বলেনি। কত বােঝালেন কিন্তু বাবার ইদানীং কেমন হয়েছিল জানিনে, দিদিকে একেবারে যেন বিষ নজরে দেখতেন। দিদি শেষে রাগে পড়ে খবরের কাগজ দেখে কোথাকার স্কুলে মাস্টারির দরখাস্ত করে, চাকরিও পায় কিন্তু বাবার হাতে তাদের চিঠি এসে পড়ে। তারপর সে কী অপমান আর কী কাণ্ড। তারপরই পরীক্ষায় ফেল হল, সে আবার এক কাণ্ড। বাবা হঠাৎ মারা না গেলে এ বিয়ে ঠিক হত। এইসব গােলমালে দিদি যেন কেমন হয়ে গেল। চিরকাল সে ভারী অভিমানী। দিদির কোনাে দোষ ছিল না, সে যে মাস্টারির দরখাস্ত করেছিল সে শুধু অপমানের জ্বালায় জ্বলে জ্বলে আর থাকতে না পেরে। তারপর বীণা আমায় বসতে বলে তাড়াতাড়ি বাড়ির মধ্যে চলে গেল এবং কিছুক্ষণ পরে পুরানাে দিনের মতাে নিজের হাতে চা ও ঝি-এর হাতে জল-খাবারের রেকাবি আর জলের গ্লাস নিয়ে ঘরের টেবিলে রেখে বললে, আসুন দিকি, খেয়ে দেখুন তাে চা-টা তবে কি আর আপনার ডাক বাংলাের বাবুর্চির মতাে হয়েছে? বীণা আগেকার চেয়েও সুশ্রী ও মাথায় বড়াে হয়ে উঠেছে। তবে ওর ধরনগুলাে ঠিক আছে, একটুও বদলায়নি। বেশ লাগে ওকে। ওঠবার সময় বীণা বললে কিন্তু আপনি কাল সকালেই আসবেন তাে? আমি মাকে বলছি, আপনি না এলে ভারী রাগ করব কিন্তু বলে দিচ্ছি। কাল রঘু মিশিরকে সকালে ডাক বাংলােয় পাঠিয়ে দেবাে এখন। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, এবারকার অফিসের কাজ শেষ হয়ে এসেছে, বেশি দিন আর ঢাকায় থাকতে হবে না, অল্পদিনের মধ্যেই কলকাতায় যেতে হবে? বরং এরপর যখন আসব ইত্যাদি। বীণা কিন্তু কিছুতেই শুনলে না, তার মনেও বেশি কষ্ট দিতে পারলাম না, রাজী হয়ে বললাম আচ্ছা তাই হবে। তবে একটু দেরি হয়ে যাবে হয়তাে, এই বেলা নটার মধ্যেই আসব। বীণা খুব খুশি হয়ে বললে আপনার সেই ঘরটাতেই থাকবেন, সকালেই আটটার আগে আমি রঘু মিশিরকে পাঠাব। চলে আসবার সময়ে আবার ডেকে বললে সকালে চা খেয়ে আসবেন না যেন, এখানে এসে খাবেন। ডাক বাংলােয় ফেরবার পথে সে দিন একটা সত্য আমার কাছে বেশ পরিস্ফুট হয়ে উঠল হঠাৎ বীণারা আমার বড়ো আপন হয়ে উঠেছে। এত অল্পদিনে যে উপকরণে
গাঁথুনি পাকা ও শক্ত হয়ে ওঠে, ওদের দিক থেকে অন্ততঃ তার কোনাে কার্পণ্য তাে ছিল না। 

আরও পড়ুনঃ গল্পঃ সতী 

মানুষের সঙ্গে মানুষের এ রকম সহজ সম্পর্ক আদান-প্রদান যে জীবনে কত বড়াে সম্পদ তা অনেক স্থলে আমরা বুঝিনে বলেই সকল সম্বন্ধকে ছােট করে দেখতে শিখি। মেয়েরা এটা কেমন সুন্দর ভাবে পারে, ওদের চরিত্রগত সেবা প্রবৃত্তি ও মুগ্ধ মনের সৌন্দর্য জগতকে যে কত দিক থেকে মঙ্গল ও কল্যাণে ভরে রেখেছে তার।
বাস্তবতা সেদিন নির্জন ডাক বাংলাের বারান্দাতে বসে মনে-প্রাণে অনুভব করলাম। সব কথা বুঝিয়ে বলা যায় না। শুধু নক্ষত্রদল যখন অনন্ত অন্ধকারের মধ্যে কাঁপে...রাত্রি অপূর্ব রহস্যময় হয়...নৈশ পাখির ডাক দূর থেকে ভেসে আসে...মনের মধ্যের নাম-না-জানা উল্লাসে সে সত্যটুকু নিজের কাছে নিজে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। ডাক বাংলােয় ফিরে দেখি আমার এক পুরানাে বন্ধু আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। তিনি insurance এর দালাল, নারায়ণগঞ্জ কাজে এসেছেন এবং সেখানেই আছেন। তার নামে তার একটা  money order এসেছে কিন্তু সেকানকার পােস্টমাস্টার তাকে চেনেন না, তাকে সনাক্ত করবারও কেউ সেখানে নেই বলে টাকা দিচ্ছেন না। এদিকে তার হাতেও এক পয়সা নেই এখন কি করা যায় ?
খুব ভােরের ট্রেনে বন্ধুকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে রওনা হলাম। যাবার সময় চৌকিদারকে বলে গেলাম কেউ এসে খোঁজ করলে বলতে যে আমি জরুরী কাজে নারায়ণগঞ্জে চলে গিয়েছি, আজই ফিরব। নারায়ণগঞ্জে কাটলাে দিন দুই। মহা হাঙ্গামা। পােস্টমাস্টার আমাকেও চেনেন না, টাকাও কিছুতেই পাওয়া যায় না। দু-একজন যাদের সঙ্গে পূর্বে পরিচয় ছিল তারা টাকা-কড়ির হাঙ্গামা শুনে পেছিয়ে গেলেন। অনেক কষ্টে শেষে। কাজ মিটলাে। ডাক বাংলােয় ফিরেই অফিসের চিঠি পেলাম বিশেষ দরকারে কুমিল্লা যেতে হবে। চিঠি এসে দু-দিন পড়ে আছে, আগেই যাওয়া উচিত ছিল, বিলম্বে কার্যে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা। ডাক বাংলাের চাপরাশি বললে, রঘু মিশির দু-দিন এসে ফিরে গিয়েছে। এদিকে ট্রেনের সময় সংক্ষেপ, ফেরবার পথেই বীণার সঙ্গে দেখা করা ঠিক করলাম। কুমিল্লা থেকে যেতে হল চটগাঁ, সেখান থেকে স্টীমারে বরিশাল, সেখান থেকে কলকাতা। তারপরেই ফাল্গুন মাসে আমার ছােট বােনের বিবাহ উপলক্ষে এক মাসের ছুটি নিয়ে বাড়ি। ছােট বােনের বিবাহ শেষ হয়ে যাবার অল্পদিন পরেই মা পড়লেন অসুখে এবং মাসখানেক ভােগবার পর চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সেরে. উঠলেন, কিন্তু চেঞ্জে যাওয়ার দরকার হল। অফিসে আরও একমাস ছুটির দরখাস্ত করাতে তারা ছুটি তাে দিলেই না বরং লিখলে, শীঘ্র কাজে যােগ না দিলে অন্য লােক বহাল করবে। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে এক লম্বা পত্র লিখলাম সেখানে। তাই এতদিন পরে আজ ভেবে দেখি জীবনের গতি অপূর্ব, অদ্ভুত। এর চেয়ে বড়াে রােমান্সের সন্ধান কেউ দিতে পারে না। বীণাকে যখন বলে আসি পরদিন সকালে তার ওখানে যাবাে এমন কি তার মন প্রফুল্ল রাখবার জন্যে তাকে কি সব বই পড়াবাে তা পর্যন্ত ভাবতে ভাবতে এসেছিলাম কখন কে জানতাে বীণার সঙ্গে দেখা তাে আর হবেই না, আমার ঢাকা যাওয়ার পথই একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর কয়েক বছর কেটে গেল। আইন পাস করে আলিপুর কোর্টে বেরুতে আরম্ভ করলাম। ভবঘুরের জীবন ক্রমে পেছনে পড়ে গেল। মাত্র নির্জন অবসর মুহূর্তে, বার লাইব্রেরি কক্ষে মক্কেলহীন দুপুর বেলায়, মাঝে মাঝে সে-সব দিনের নানা কথা মনে পড়ে তখন যেন স্বপ্নের মতাে ঠেকে। এই সব স্মৃতিতেই জীবন মধুময় হয়ে ওঠে, জীবনের কুঞ্জবনে এরাই গায়ক পাখি, ফুল-ফলে সকাল দুপুরের সঙ্গে সুরমেলাননা অনন্তমুখী সঙ্গীত এদেরই নিভৃত নীড়ান্তরাল থেকে শােনা যায়। বিবাহের অনুরােধে বাড়িতে তিষ্ঠানো দায়। জ্যাঠামশায় ভবানীপুরে কোথায় বিবাহের সম্বন্ধ ঠিক পাত্রী দেখে এসে খুব প্রশংসা করলেন। জ্যাঠাইমার অনুরােধে তাদের বাসা থেকে রওনা হয়ে বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে একদিন মেয়ে দেখতে গেলাম। বেলতলা রােডে একতলা ছােট বাড়ি। বাড়ির সামনে ছােট্ট একটু কম্পাউন্ড, গেটের ওপরকার লােহার জালতিতে থােকা থােকা মাধবীলতার গুচ্ছ। আমরা গিয়ে বৈঠকখানায় বসবার অল্পক্ষণ পরেই মেয়েকে আনা হল। তার মুখের দিকে চেয়েই আমি চমকে উঠলাম বিস্ময়ে আমার মুখ দিয়ে  কোনাে কথা বার হলোনা।
বীনা.....!কিন্তু এ কোন্ বীণা? চার বছর আগের যে চঞ্চলা বালিকা নয়, অনিন্দ্যসুন্দরী, ধীরা, সংযতা তরুণী! মেয়ের মামা পরিচয় দিলেন মেয়েটি বেথুনে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, ম্যাট্রিক ফার্স্ট ডিভিসনে পাস করেছে, পড়াশুনায় বেশ ভালাে। বাপ ঢাকার উকিল ছিলেন, মারা গিয়েছেন। বীণা চোখ নিচু করে ছিল, আমায় দিকে চায়নি, সে বােধহয় জানেও না যে আমিই পাত্র। বাড়ির বার হয়ে এসে বন্ধুরা আমাকে ভাগ্যবান বললেন। ওরকম পাত্রী অদৃষ্টে জোটা ইত্যাদি। কাউকে কোনাে কথা বললাম না। শুভদৃষ্টির সময় কাপড় ঢাকা দিয়ে দেওয়া হল না, এমনই দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে দেখলাম বীণার মুখের অবস্থা ফোটোগ্রাফ নেবার যােগ্য হয়েছিল। অনেক রাত্রে বাসরে সে শাসনের সুরে বললে আপনি তাে আচ্ছা? তলে তলে বুঝি এইসব কু-মতলব ছিল? আমি উত্তর দিলাম আমি বুঝি জানি? মেয়ে দেখবার দিন তাে আমি জানলাম। আগে জানতে পারলে তুমি বােধহয় কিছুতেই এতে রাজী হতে না-না? বীণা রাগে ঘাড় দুলিয়ে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলে। আমার দিকে না চেয়েই বললে কোথায় ছিলেন এতদিন নিরুদ্দেশ হয়ে। আর এলেন না কেন সেবার ? সংক্ষেপে কৈফিয়ৎ দেবার পর আগ্রহের সুরে জিজ্ঞাসা করলাম প্রতিমাকে দেখছি সে কি এখানে আসেনি আজ? এবার বীণা আমার মুখের দিকে চাইলে, চেয়ে চুপ করে রইলাে। তারপর সংযত সুরে বললে–জানেন না? দিদি নেই-সেবারেই মাঘ মাসে মারা যায়। মাথা তার ভালাে হয়নি। আপনার নাম বড়াে করত, আমার কাছে কতদিন বলেছে।

                              

                                 (সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য