Heart Touching Bengali Sad Love Story | হৃদয় ছোঁয়া ভালোবাসার গল্প

আজকের Bengali sad love story টির নাম - "দ্বিতীয় শরীর" গল্পের প্রধান চরিত্রে সুধা ও শ্যামলী, বিষয় - বেদনাদায়ক ভালোবাসা, Valobashar golpo এবং  Bangla mojar jokes অথবা Romantic Bangla love Story আরও পাওয়ার জন্য আমাদের ব্লগ টিকে সাবস্ক্রাইব করে আমাদের সাথে থাকুন, গল্পটি পড়িয়া যদি আপনার ভালো লাগিয়া থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট এবং শেয়ার করিতে ভুলিবেন না।

Bengali sad love story

Sad Love Story in Bengali - হৃদয়ছোয়া গল্প

আজকের গল্প - দ্বিতীয় শরীর 

গরমের ছুটির পর হেডমিস্ট্রেস সুধা সেনগুপ্ত যখন স্কুলে ফিরে এলেন তখন তার সিঁথিতে সিঁদুরের একটা সূক্ষ্ম রেখা হাতের বালার সঙ্গে সাদা শাঁখা দেখা যাচ্ছে, রিস্ট ওয়াচটাও নতুন। এসেই সই করলেন, সুধা মিত্র। স্কুলে হৈ চৈ উঠল।
একি কাণ্ড সুধাদি! আমরা জানতেও পারলুম না! সুধা মিত্রের ফর্সা গাল রাঙা হল। রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হঠাৎ হয়ে গেল  কাউকেই তেমন খবর দেওয়া হয়নি। স্কুলের সেক্রেটারি হেসে বললেন, অভিনন্দন। কিন্তু আমরা তাে এমনি ছাড়বাে না। খাওয়াতে হবে বেশ, কবে খাবেন বলুন। এখন নয়, মিস্টার মিত্র আসুন জোড় মিলুক তারপর। আর একজন জুড়ে দিলেন তার সঙ্গে দু’দিন খাওয়া আদায় করতে হবে দু’জনের কাছ থেকেই। মাথা নামিয়ে সুধা মিত্র বললেন, বেশ, তাই হবে। শুধু শ্যামলী সােমের মুখ থমথম করতে লাগল। এমনিতেই সে গম্ভীর, আরাে গম্ভীর হয়ে বীজগণিতের পাতা উটে চলল। সুধা সেনগুপ্ত আর শ্যামলী সোম একই কলেজের সহপাঠিনী। সুধা হৈ চৈ করতে ভালবাসত, কলেজের ফাংশনে মণিপুরী নাচ নাচত, কলেজ স্পাের্টসেও যােগ দিত কখনাে কখনাে।


হস্টেলের মেয়েদের লুকোনাে খাবার খুঁজে বের করে নিঃশব্দে লােপাট করবার কাজে তার জুড়ি ছিল না। শ্যামলীর স্বভাব ছিল ঠিক উলটো। একটা বিষগ্ন গাম্ভীর্য তাকে ঘিরে থাকত সব সময়-হস্টেল আর স্কুলের মাঝখানে কৃষ্ণনগর নামে একটা শহরের অস্তিত্ব কোথাও আছে একথা তার কোনদিন মনে হয়নি ঝুলন কিংবা বারদোলের মেলা কিছুই তার ধ্যান ভাঙ্গাতে পারেনি। তবু আশ্চর্য বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল দু'জনের ভেতর। যেন বৈজ্ঞানিক নিয়ম যেমন করে ঋণাত্মককে টানে। বি. এ. পাস করবার পর এল বিচ্ছেদ। বছর দুই পাতার পর পাতা শ্যামলীকে চিঠি লিখত সুধা জবাব দিতে গিয়ে এক ঘণ্টা ধরে কলম কামড়ে আট লাইনের বেশী কথা জুটত না শ্যামলীর। তারপর যেমন হয় জীবনের দুই দিগন্তে মিলিয়ে গেল দু'জনে। আরাে চার বছর পরে এম. এ., এম. এড.-হেডমিস্ট্রেস সুধা সেনগুপ্ত অ্যাপ্লিকেশনের ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে শ্যামলী সােম বি.এ.বি.টি-র দরখাস্ত পেল। কলেজের নাম বি.এ. পাশের বছর সন্দেহ মাত্র রইল না। স্টেশনে নেমে শ্যামলী দেখল, প্ল্যাটফর্মে সুধা দাঁড়িয়ে।
তুই এখানে?
তাের জন্যেই তাে।
সত্যি? 

আনন্দে শ্যামলীর চোখ জ্বলতে লাগল তুইও বুঝি এই স্কুলে স্কুলের বেয়ারা এগিয়ে এল সেই সময়ে। বললে, বড়দি, জিনিসগুলাে তা হলে- হ্যাঁ, রিকশায় তুলে দে। আমার কোয়ার্টারেই যাবে। বড়দি! শ্যামলী যেন অভ্যাসেই দু-পা পিছিয়ে গেল  তুই-তুই তবে হ্যা ভাই, হেডমিস্ট্রেস। কী করব-বরাতের দোষ। তার জন্য শুরুতেই তুই পর করে দিবি নাকি? না-নামানে শ্যামলী, কথা খুঁজে পেলাে না। আচ্ছা, পরে হবে ওসব। এখন তাে বাড়ি চ। আর চার বছর ধরে কত কথা জমে আছে তাের সঙ্গে সারারাত বকেও শেষ হবে না। আয়-আয় প্রায় টানতে টানতে শ্যামলীকে নিয়ে চলল রিকসার দিকে। সেই যে নিয়ে গেল, তারপর থেকেই নিজের কাছেই রেখেছে। টীচার্স মেসে চলে যাওয়ার কথা দু-একবার তুলেছিল শ্যামলী, সুধা প্রায় তেড়ে এসেছে। কেন, এখানে কী অসুবিধেটা হচ্ছে শুনি? অসুবিধে আমার নয়। খামােখা তাের ওপর চড়াও হয়ে চড়াও আবার কিসের? তিনটে ঘর রয়েছে আমার, কী কাজে লাগে শুনি? অন্য খরচা সবই তাে দিচ্ছিস। মিথ্যে গণ্ডগােল করছিস কেন?

অভিমানে ছলছল করে উঠল সুধার চোখ একলা বাড়িতে থাকি-রাত্তিরে চোর ডাকাত এসে যদি খুনও করে যায় কেউ দেখবার নেই। আচ্ছা বেশ, ভাল না লাগলে চলে যা। শ্যামলী হাসল তাের কোয়ার্টারের লাগাও প্রেসিডেন্টের বাড়ি  সামনে একশ’ গজ দূরে থানা। ডাকাত এসে গলা টিপে ধরলে কেউ কিছু করতে পারবে না। শ্যামলীও যে বিশেষ কিছু করতে পারবে তা নয়। আর ডাকাত যে এ বাড়িতে কখনাে আসবে না এ কথা শ্যামলীর চাইতে সুধা আরও বেশী করেই জানে। তবু চলে যাওয়া যায় না। সব কিছুর ওপর সুধার সেই ব্রম্মাস্ত্র ও কপালদোষে হেডমিস্ট্রেস হয়েছি বলে তুইও যে আমায় এমন ভাবে পর করে দিবি, এ আমি কোনদিনই ভাবিনি। শ্যামলীর আসল কাটাটা এখানেই। সাধারণ অ্যাসিসট্যান্ট টীচার হয়ে হেডমিস্ট্রেস-এর বান্ধবীর ভূমিকা কেমন যেন লজ্জাকর মনে হয় তার। কলেজের দিনগুলাে ছিল আলাদা কিন্তু এখন! আর শ্যামলীর ওই দুর্বলতাটা জানা আছে বলেই সুধা বার বার এমনভাবে কথাটা তােলে যে, কাথাটার অস্তিত্ব প্রাণপণে গােপন করে যেতে হয় শ্যামলীকে। 

তবু সাত আট মাসে অনেকখানি সহজ হয়ে এসেছিল। সুধা সেনগুপ্তের অসাধারণ পপুলারিটি এখানে-ছাত্রীরা শ্রদ্ধা করে, টীচারেরা ভালবাসে, গভর্ণিং বডি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে তাকে। তাই যেখানে সব চাইতে বেশি ভয় ছিল অন্য টীচারের ঈর্ষার উত্তাপ বিন্দুমাত্র টের পেতে হয়নি শ্যামলীকে। কিন্তু এতদিন পরে আবার মেঘের ছায়া পড়েছে। সুধা সেনগুপ্ত নয় সুধা মিত্র। সরু সিঁদুরের রেখা জ্বলছে সিথেয়। শুধু হেডমিস্ট্রেস নয় তাকে সয়ে গিয়েছিল দু’জনের মাঝখানে আর একজন এসে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে এখন। অন্য টীচারদের মত, সেক্রেটারীর মত শ্যামলীও খুশী হতে চেয়েছিল, বলতে চেয়েছিল, congratulation কিন্তু কিছুতেই বলতে পারল না। মনটা আশ্চর্যভাবে আড়ষ্ট আর সংকীর্ণ হয়ে উঠল তার। সুধার ফিরতে দেরী হবে স্কুল কমিটির জরুরী মিটিং আছে আজকে। শ্যামলী একাই ফিরল। 


আরও পড়ুনঃ গল্পঃ মণি 

জামা-কাপড় বদলাল, গা ধুতে গিয়ে অন্যমনস্কভাবে চুল ভিজিয়ে ফেলল, তারপর ভেজা চুল মেলে দিয়ে নিজের ঘরটির জানালার পাশে বসে পড়ল তক্তপােশের ওপর। এই জানালায় বসে একটি নদী দেখা যায় কিছু দূরে শিলাই, ভাল নাম শিলাবতী। দেখা যায় বালির চর-চোখে-পড়ে খেয়াঘাটের একটুকরাে খড়ের চালা। নদীর ওপারে বিকেলের লাল রঙ, সেই লালের নীচে কালাে ছায়া পড়তে শুরু হয়েছে। কয়েকটি মানুষের বিন্দু, একপাল মােষ চলেছে এখান থেকেও দেখা যায় পায়ে ধুলাে উড়ছে তাদের। শ্যামলী চেয়ে রইল সেদিকেই। মনের মধ্যেও সন্ধ্যা নামছে তার। সুধা বিয়ে করে এল, অথচ তাকে পর্যন্ত খবরটা দিল না একবার। একটা চিঠি পর্যন্ত লিখতে পারল না। তার চেয়ে বড় কথা রেজিস্টার্ড ম্যারেজ। তার মানে অনেকদিন আগে থেকেই জের চলছিল ব্যাপারটা হঠাৎ ঘটেনি। কিন্তু এই আট মাসের ভেতরে একদিনের জন্যও সুধা মুখ খােলেনি তার কাছে। একবারও বলেনি, আরাে একটা আড়াল তৈরী হয়েছে দুজনের মাঝখানে। ইচ্ছে করেই বলেনি হয়তাে। আর শ্যামলী নিজেই তার কারণ! 

মাস পাঁচেক আগের কথা। স্কুলের আর একজন টীচার বিয়ে করে রিজাইন দিয়ে চলে গেল। সুধা বলেছিল, লীলার স্বামীকে দেখলুম ভাই। বেশ ছেলেটি। লীলা সুখী হবে। শ্যামলী চুপ করে থেকেছিল কিছুক্ষণ। তারপর জবার দিয়েছিল, না সুখী হবে না মরবে। সুধা চমকে উঠেছিল হঠাৎ, এমন উত্তর কেন রে! কেউ তােকে বিট্রে করেছে নাকি ? না, সে দুর্ভাগ্য আমার হয়নি। একথা বলছিস কেন তবে? পুরুষ জাতটাকে জানি বলে। ওরা ওই রকম লােভী, স্বার্থপর মেয়েদের এক্সপ্লেয়েট করা ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য নেই ওদের। আচ্ছা, আচ্ছা, তােরও দিন আসবে। অন্য কথা শুনতে পাব তখন। না, সে রকম দিন কখনাে আসবে না আমার। বিদ্বেষটা আজকের নয় ছেলেবেলা থেকে জমে উঠেছে চেতনার গভীরে। সেই কৃষ্ণনগর শহরে তাদের পাশের বাড়ির ওভার-শিয়ার ভদ্রলােক। প্রায়ই মাঝরাতে আকণ্ঠ মদ গিলে ফিরে আসত বে-পাড়া থেকে, তারপর স্ত্রীকে ধরে ঠ্যাঙাতো। সেই যন্ত্রণার গােঙানি আর কদর্য চিৎকার রাতগুলােকে কী বীভৎসভাবে আবিল করে দিত।

বৌটির মুখখানা এখনাে মনে পড়ে সাদা শঙ্খের মত রক্তহীন মুখের রঙ-কঙ্কালসার হাতে দু-গাছা লাল কাঁচের চুড়ি, কুঁজো হয়ে কুয়ােতলায় বসে এক পাঁজা বাসন মাজছে! তারপর কলকাতায় বি. টি. পড়বার সময়। সেই বিবাহিতা মেয়েটি পড়তে এসেছিল তাদের সঙ্গে। চাকরি করে সংসার চালাই ভাই, তবু চার পাঁচটা ছেলেমেয়ে। ওঁকে বলি, দোহাই তােমার আমাকে দয়া করাে, আর আমি পারি না। অনেক তাে হল, এবার আমায়। রেহাই দাও, আজকাল তাে কত রকম অপারেশন টপারেশান হয়েছে। উনি বলেন আমরা নৈহাটি-ভাটপাড়ার পণ্ডিত বংশ, এসব পাপ কথা মুখেও আনতে নেই। ছেলেবেলার ঘৃণাটা আরাে তীব্র হয়েছে, আরাে ভাল করে শেকড় মেলেছে মনের ভেতর। সুধা সে ইতিহাস জানে না, কিন্তু শ্যামলীর মন বুঝতে পেরেছে সে। তাই হয়তাে সমস্ত জিনিসটাই এমন করে তার কাছে লুকোতে হয়েছে সুধাকে।

সেদিক থেকে সুধার ওপর রাগ করা যায় না। কিন্তু শিলাবতীর ওপর সন্ধ্যা নামল। মানুষগুলােকে চোখে পড়ে না আর। একটা আলাে জ্বলে উঠল মিটমিট করে। খেয়াঘাটের আলাে। আলােটার দিকেই চেয়ে রইল শ্যামলী। ওই নদীটা পার হয়ে লােকগুলাে কোথায় যায় বালির চর পেরিয়ে, মাঠ পেরিয়ে কোথায় গ্রাম আছে কত দূরে? চুলগুলাে ভাল করে মােছা হয়নি, গায়ের ব্লাউজ অনেকখানি ভিজে গেছে, হঠাৎ শ্যামলীর শরীরে একটা শীতার্ত শিহরণ জাগল। মনে হল, কখন যেন, তার শরীর থেকে আর একটা শরীর বেরিয়ে চলে গেছে, পার হয়ে গেছে শিলাই নদীর রাত্রির কালাে জল, তারপর অন্ধকার বালির চর ছাড়িয়ে-বাতাসে শোঁ শো করা বা মনের ভেতর দিয়ে কোথায় একা এগিয়ে চলেছে সে। 


দিগন্তের শেষ সীমান্তেও একটি আলাে নেই কোথাও একটি গ্রামের চিহ্নও কোনখানে চোখে পড়ে না। শ্যামলী চমকে উঠল। আশ্চর্য কেন এই অর্থহীন ভাবনা? এমন একটা অদ্ভুত চিন্তা কেন এল তার মনে? ঘরে জুতাের শব্দ। একটা তীব্র আলাের জোয়ার। সুধা সুইচটা টিপে দিয়েছে। কিরে, অমন করে অন্ধকারে যে? এমনিই। শ্যামলী অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে নিতে চেষ্টা করল। এত তাড়াতাড়ি মিটিং হয়ে গেল আজ? কয়েকটা ফর্মাল ব্যাপার ছিল। সুধা হঠাৎ বসে পড়ল শ্যামলীর পাশে, দু-হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরল তার। খুব রাগ করেছিস আমার ওপর না?
রাগ করব কেন? বিয়ের কথা তােকে তাে আগে বলিনি। সুধা দ্বিধা করল একটু সত্যি বলতে কি, অনেকবার বলবার জন্য মুখ চুলবুল করে উঠেছে, কিন্তু সামলে নিয়েছি সঙ্গে সঙ্গেই, তােকে তাে জানি। বলে বসবি-দাউ টু ব্রুটাস ? শ্যামলী জোর করে হাসল ও আমাকে এতটা মারাত্মক ভাবলি কেন তুই? 

আমার নিজের মত যা-ই হােক, সেটা তাের ওপর কেন আমি চাপিয়ে দিতে চাইব? তাই তাে নিয়ম ভাই। নিজের চোখ দিয়েই সবাই অন্যকে দেখে। তা হলে তুই রাগ করিসনি তাে? আজ সকালে এসে পৌঁছানাের পর থেকে তাের সামনে কী যে ভয়ে ভয়ে আছি- কী পাগলামি করছিস সুধা। কী করে বিয়ে হল তাই বল। সুধার বিয়ের ইতিহাসে একবিন্দু কৌতূহল ছিল না, তবু শ্যামলীর মনে হল, তার কাছে এই কথাটা শােনবার জন্যই সুধা অপেক্ষা করে আছে। আর ঠিক তাই ঘটল। সুধা আর খাট ছেড়ে উঠল না, স্কুলের জামাকাপড় ছাড়ল না, শ্যামলীর কতগুলাে হােমটাস্কের খাতা ছিল সেগুলাে দেখতে দিল না তাকে; ঝি-কে দিয়ে বার তিনেক চা আনালাে, তারপরে গলার স্বরে সুখ আর লজ্জা মিশিয়ে সমস্ত কাহিনীটা বলে যেতে লাগল। আলাপ হয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। পাশ করবার পরেও সম্পর্ক মুছে গেল না, আরাে ঘন হয়ে উঠল দিনের পর দিন। কিন্তু একটা রােজগারের সুরাহা না হলে ছেলেটির সাহসে কুলােয় না। ইকোনোমিক্সে এম.এ., এতদিনে ব্যাঙ্কে মােটামুটি ভাল চাকরি পেয়েছে একটা। বাধা? ছিল বই কি? সুধার বাপ ভয়ঙ্কর কনজারভেটিভ, কিছুতেই যাবেন না জাতের বাইরে। 

আরও পড়ুনঃ গল্পঃ রোমান্স 

আজকের দিনেও কি মেন্টালিটি ভেবে দ্যাখ! মা আপত্তি করেননি, কিন্তু বাবার অমতেই সিভিল ম্যারেজটা সেরে নিতে হয়েছে ছুটির ভেতরে। লােক-টাকে দেখলে তাের মায়া হবে শ্যামলী। সুধার ঘরে সত্যিকারের সুধা ঝরে পড়ল কী হােপলেসলি ছেলেমানুষ! মেসের চাকর নতুন জুতাে জোড়া পায়ে দিয়ে দেশে চলে গেল, চোখের সামনে দেখেও একটা কথা বলতে পারল না। তিন মাসের ভেতর দু’বার ট্রামে পকেট মেরে দিয়েছে। বন্ধুরা টাকা ধার নেয়, কেউ ফেরৎ দেয় না, অথচ মুখ ফুটে চাইতে পারে না কোন দিন। বলতাে ভাই, আমি কী করি এই ভােলানাথকে নিয়ে ? মাথার ভিতর কেমন একটা যন্ত্রণা হচ্ছে শ্যামলীর। দূরে নদীর দিকটা যেখান অন্ধকারে কালাে হয়ে গেছে, সেখান থেকে খেয়াঘাটের আলােটা যেন তার চোখে তীরের মত বিধছে। অনেকক্ষণ তাে হল তবু কেন চুপ করতে পারে না সুধা? ভদ্রতার খাতিরেই বলতে হল ? সেই ভােলানাথকে তবু ফেলে চলে এলি ? কি করব ভাই।

এক বছর কষ্ট করতেই হবে। ওর চাকরিটা কনফার্ম হলে কলকাতায় ফস করে একটা বাসা বাঁধা বুঝিস তাে? তবে চেষ্টা আমিও করছি। কলকাতার একটা স্কুলে যদি কিছু জোটাতে পারি, তাহলে আর অসুবিধে থাকে না। অর্থাৎ, তৎক্ষণাৎ চলে যেতে পারি এখান থেকে। শ্যামলীকে অনায়াসে পেছনে ফেলে চলে যাবে, তার কথা মনে পড়বে না একবার। অথচ, স্টেশনে নামবামাত্র তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ভাই, তুই এখানে আসবি জেনে আনন্দে তিন রাত আমি ঘুমুতে পারিনি। ভিজে ব্লাউজটার ছোঁয়ায় আর একবার শিউরে উঠল শরীর। আর একবার মনে হল, নদীর ওপারে সেই অন্ধকার মাঠটার ভেতর দিয়ে, সেই রাত্রির হাওয়ায় শনশনানি জাগা বাবলা বনের ভূতুড়ে ছায়ার তলা দিয়ে তার আর একটা নিঃসঙ্গ শরীর কোথায় কতদূর এগিয়ে চলেছে সেই পথটার কোন শেষ নেই, সেই অন্ধকারটার কোন সীমা নেই কোথাও।


তবু আরাে একমাস ধরে ধীরে ধীরে সয়ে এল শ্যামলীর। সরে এল মােটা মােটা থামগুলাে! আসবার সঙ্গে সঙ্গে চোরের মত সুধার ঘরের মধ্যে পালিয়ে যাওয়া। ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার পর তার চোখে একটা চঞ্চল আলাে, ফর্সা গাল দুটিতে রক্তের ছােপ। শ্যামলীকে বারবার কী বলতে গিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নেওয়া। একটা তীব্র বিরক্তির জোয়ার আসে মনে। ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়েস হল সুধার, একটা স্কুলের হেডমিস্ট্রেস অথচ চোখে মুখে কিশােরীর মত এমন ভাব ফুটে বেরােয় যে শ্যামলীর গা জ্বালা করতে থাকে। ন্যাকামাে ছাড়া কী আর! আট দশ পাতা ধরে কী-ই বা লেখবার আছে চিঠিতে আর সে চিঠি পড়বার পরে এমন ছটফট করবারই বা কী মানে হয়।  এই সময় টীচার্স মেসে চলে গেলে মন্দ হয় না। এখন শ্যামলীকে না হলেও বিন্দুমাত্র অসুবিধে হবে না সুধার। সেই কথাটা বলবার জন্য তৈরী হচ্ছিল শ্যামলী, হঠাৎ জ্বরে পড়ল। জ্বরটা সাংঘাতিক কিছু নয়—ইনফ্লুয়েঞ্জা। কিন্তু দারুণ দুর্বল করে ফেলল। 

সুধা বললে, কেন মিথ্যে স্কুলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হচ্ছিস? পড়ে থাক দিন চারেক। তৃতীয় দিনে একা পড়ে থাকতে অসহ্য লাগল। বাইরে জ্বলন্ত দুপুর, শিলাবতীর দিকে ধুলাের ঘূর্ণি উঠেছে দেখা যায়। জ্বরটা সামান্য, মাথায় যন্ত্রণা রয়েছে, কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকতে জ্বালা করছে সারা শরীর। স্কুল থেকে গােটা কয়েক নতুন ইংরেজি বই এনেছে সুধা- তারই একটা এনে নাড়াচাড়া করা যাক। শেলফ থেকে বইখানা বার করতেই ফিকে নীল রঙের খাম পড়ল একখানা। ছি ছি, কী অসাবধানী! এসব চিঠি কি এমন করে বাইরে রাখতে হয়। প্রায়ই তাে অন্য টীচারেরা সুধার কাছে এ-ঘরে আসে, বইপত্রও নাড়াচাড়া করে, তাদের কারাে হাতে যদি চিঠি সুদ্ধ বইখানা রেখে দিতে গিয়েও শ্যামলী থামল। সারা শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জার অস্বস্তি, মাথার মধ্যে যন্ত্রণা, বাইরে তীব্র রােদের একটা চাপা উত্তাপ এসে যেন ছড়িয়ে গেল তার জ্বালাধরা রক্তের ভেতর।

শ্যামলী চেষ্টা করল, বারবার চেষ্টা করল, ঠোটের ওপর দাঁতের চাপ দিয়ে নিজেকে রক্তাক্ত করতে চাইল, তবু সে পারল না কিছুতেই পারল না। খামখানা যখন খুলল তখন তার হাতদুটো থরথর করে কাঁপছে। এই রােদ এই জ্বর-স্নায়ুর ভেতরে এই জ্বালা না থাকলে সব অন্য রকম হয়ে যেত। ওই খামখানা দেখবামাত্র শ্যামলী ছুটে পালাতত এই ঘর থেকে। কিন্তু নেশার ঘােরে সে সেই আট পাতার চিঠিখানা সবটা পড়ে গেল, পড়তে পড়তে বারবার চোখ বুজে গেল, বারবার নিজেকে বলতে হল, আমি পড়ব না পড়ব না পড়ব না, তবু তিনবার পড়ে ফেলল চিঠিটা! তারপর হঠাৎ যেন নেশাটা ছুটে গেল তার, দৌড়ে পালিয়ে গেল নিজের ঘরে, বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে মাথার বালিশ ভিজিয়ে দিতে লাগল চোখের জলে। এ আমি কী করলুম, এ কী অধঃপতন হল আমার! বিকেলে যখন সুধা ফিরল, তখন তার দিকে চাইতে পর্যন্ত পারল না শ্যামলী। নিজের অপরাধের ভারে যেন লুকোবার জায়গা পর্যন্ত খুঁজে পেল না কোথাও।

কিরে মুখ ঢেকে শুয়ে আছিস কেন অমন করে? সুধা ভয় পেয়ে বললে, জ্বর বাড়ল নাকি? আমাদের ডাক্তারবাবুকে খবর দেব? ডাক্তারবাবু খানিকটা ঘরের লােক। স্কুলে হাইজিন পড়ান। না, জ্বর বাড়েনি। এমনি শুয়ে আছি। তবে অমন করে চাদর চাপা দিয়েছিস কেন? মুখ খাে- খােল। কাউকে অমনভাবে মুখ ঢেকে শুয়ে থাকতে দেখলে বাপু আমার দারুণ ভয় করে। আমাকে একটু ঘুমুতে দে সুধা। আচ্ছা, ঘুমাে তবে। একটা কুৎসিৎ আত্মগ্লানির মধ্য দিয়ে বিকেল কাটল, সন্ধ্যা কাটল, যন্ত্রণাভরা ছাড়া-ছাড়া ঘুমের ভেতর দিয়ে রাত কাটল। সারা সকাল ধরে জোর করে টীচার্স মেসে চলে যাওয়ার জন্যে নিজেকে তৈরি করল শ্যামলী। তারপরেও সাড়ে দশটায় স্কুলে বেরিয়ে গেল সুধা শ্যামলীকে খাইয়ে দিয়ে, কী তার ভাত নিয়ে বাড়ি চলে গেল, আর ধীরে ধীরে হেড মিস্ট্রেসের কোয়ার্টারের ওপর নির্জন দুপুর নামল। শিলাইয়ের জল আর বালির চর জ্বলতে লাগল রােদে, হাওয়ায় একটা উত্তাপ আসতে লাগল। 


জ্বর ছিল না তবু জ্বরের যন্ত্রণা শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দুকে বিদ্ধ করতে লাগল, আর মাথার ভিতরে ধীরে ধীরে সব বিশৃঙ্খল হয়ে যেতে লাগল শ্যামলীর। সুধার ঘরটা তাকে টানছে। আগুন যেমন করে টানে পতঙ্গকে। যেমন করে পাহাড়ের খাড়াই টানে অতলের দিকে। বারবার বিছানা ছেড়ে উঠল শ্যামলী, বারে বারে বসে পড়ল। তারপর বিদ্যুৎ চমকের মত একটা কথা জেগে উঠল মনে। কেন এত সংকোচ? কিসের তবে দ্বিধা? চিরকাল বান্ধবীরা এ-ওর চিঠি দেখে দেখায়। নিজেদের ভেতর কোন লজ্জার আড়াল রাখে না তারা। এ ছবি সে তাে নিজেদের বাড়িতেই দেখেছে, তাদের হস্টেলের দুটি বিবাহিতা মেয়ের কথাও সে ভােলেনি। বিদ্যুৎ না, যেন তলােয়ার ছকে গেল একখানা। সমস্ত দ্বিধাকে দু'টুকরাে করে দিয়ে গেল। সে চিঠি দেখেছে জানলে সুধা রাগ করবে না, বরং তার কাছ থেকে একটু প্রশ্রয় পেলে নিজেই দেখাতে যেত এর আগে । শ্যামলী উঠে দাঁড়াল। এবার তার পা কাপল, মন টলল না। বইয়ের ভিতরে আর চিঠি নেই।

তীব্র উত্তেজনা আর নৈরাশ্যে শ্যামলীর মনে আগুন জ্বলতে লাগল। আকণ্ঠ পিপাসার সামনে কে যেন জলের পাত্রটা সরিয়ে নিয়েছে এমনি মনে হল তার। অসহ্য অন্তর্জালায় দাঁতে দাঁত চাপল সে। বাক্সের ভেতরে চিঠি লুকিয়ে রেখেছে সুধা! তার কাছে যে চাবির রিং আছে, তাই দিয়ে চেষ্টা করে দেখবে নাকি একবার? কিন্তু তার আগে আশ্চর্য নির্ভুল অনুমান। বিছানার তােশকের নীচেই পাওয়া গেল। আরাে চারখানা। সবটাই একদিন পড়বে। কিছু রাখবে না ভবিষ্যতের জন্যে ? কিন্তু আবার কবে সময় হবে কে জানে। সহজে কি সুযােগ পাওয়া যাবে আর? কাল তার স্কুলে জয়েন করতে হবে। আজই। ফেলে রাখা চলবে না। তাছাড়া আরাে চিঠি তাে আসবে সুধার। আর প্রায়ই শনি- রবিবার স্কুলের পরে রাত সাত-আটটা পর্যন্ত তার কমিটি মিটিং থাকে। শ্যামলী খাম খুলতে লাগল। 


একখানার পর একখানা। দিন বয়ে চলল। আকাশ ছেয়ে বর্ষার কাল মেঘ এল, শিলাইয়ের সাদা জল গেরুয়া রং ধরে বালুচর ছাপিয়ে বয়ে গেল, খেয়াঘাটের চালাটাকে কোনদিকে সরিয়ে নিলে কে জানে। স্কুলে মাঝে মাঝে রেনি-ডে হতে লাগল আর চায়ের সঙ্গে গরম ফুলুরির ফরমাস দিয়ে শ্যামলীকে উজ্জ্বল চোখে বার বার কী বলতে গিয়েও সামলে নিতে হল সুধাকে শেষ পর্যন্ত।
দিনটা বেশ, না রে শ্যামলী?
ই, ছুটি পাওয়া গেল।
ধেৎ ছুটির জন্যে নয়। অঙ্ক কষে কষে একেবারে প্রােজেইক হয়ে গেছিস তুই-সুধা গুনগুন করতে লাগল। ‘শাওন আর সখি কাহারে নাগরিয়া দ্রিমিকি দ্রিমিকি দ্রিমি বােলত গগনরে- শ্যামলী বিষাদ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ঠিক বুঝতে পারে না আজকাল কেন তার সুধাকে এত খারাপ লাগে মধ্যে মধ্যে। মনে হয় সুধা বড় বেশি তরল, বড় বেশি অগভীর। 

এত চলমান, এমন ছটফটে মন নিয়ে সত্যিই কি সে ভালবাসতে পারে কাউকে ? কলকাতা থেকে যে নির্বোধ মানুষটা মৃদু সুগন্ধ জড়ানাে ফিকে নীল চিঠির কাগজে মুক্তোর মত হাতের লেখায় আট-দশ পাতা প্রেমের উচ্ছাস তাকে পাঠায়, সেই চিঠিগুলাে সম্পূর্ণ বােঝবার মতাে মন কি সুধার আছে? মত্ত মৌর রােয়ে রােয়েরে দাদুরিয়া- কী ভেবে গান বন্ধ করল সুধা। চেয়ে দেখল শ্যামলীর দিকে। এই তাের হয়েছে কী বলতাে? দিনের পর দিন যে আরাে বেশি করে মাষ্টারনী হয়ে যাচ্ছিস! মাষ্টারি করতে গেলে মাষ্টারনিই তাে হওয়া দরকার। মােটেই না। তাহলে তাে কোর্ট থেকে ফিরে উকিলকে স্ত্রীর সঙ্গে মামলা করতে হয়! একটা আলাদা জীবন থাকবে না তার?
সকলের থাকে না। আমি দুটোকে একসঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছি। বলেই থমকে গেল শ্যামলী। মিথ্যে কথা বলেছে সুধার কাছে। যেদিন থেকেই চিঠি চুরি করে পড়া শুরু করেছে, সেদিন থেকেই আর একটা জীবন আরম্ভ হয়েছে তার। শ্যামলীর মুখ লাল হয়ে উঠল।


মিথ্যের লজ্জায় মুহূর্তে নিজের কাছে কুঁকড়ে গেল সে। কী যেন বলতে যাচ্ছিল সুধা, তার আগেই গেটের সামনে তালি মারা ছাতা দেখা দিল একটা। তারপর গেট খুলে, ছােট লনটির ঘাসের ভেতর থইথই জলে, রবারের জুতাে ছছ করতে করতে হলদে পােশাক আর হলদে ব্যাগ নিয়ে দেখা দিল ডাকপিয়ন। 
সুধা একলাফে উঠে দাঁড়াল; হৃৎপিণ্ড দুলে উঠল শ্যামলীর ঝা ঝা করতে লাগল কানের ভেতর। এই প্রথম নয়। আজ তিন সপ্তাহ ধরে পিয়ন আসবার সময় হলেই এমনি করে করে রক্তে তার ঢেউ উঠে, এমনি করেই বুকের ভেতরে ঝড় দেখা দেয় তার। সুধার মতই সে-ও ঠিক জানে কবে সেই মােটা খামখানা আসবে, মৃদু সুরভির একটি নীল চিঠির কাগজে পাতার পর পাতা জুড়ে মুক্তোর মত হরফে লেখা থাকবে আকুল মানুষের উচ্ছাস। ইকনমিকসের এম. এ., ব্যাঙ্কে চাকরি করে কী করে লেখে এত ভাল কথা, কোথায় পায় এতসব? শ্যামলী জ্বলন্ত চোখে চেয়ে রইল। চিঠিটা পেয়েছে সুধা। চা-টা একটুখানি খেয়েছিল, সেটা সেইভাবেই পড়ে রইল, চিঠি নিয়ে গেল নিজের ঘরে। আর বসে রইল শ্যামলী। 

চিঠিটা সুধাকেই লেখা সুধাই আগে পড়বে সেইটেই স্বাভাবিক, কিন্তু কিছুতেই মনের জ্বালাকে শান্ত করতে পারল না। সুধা তরল, কখনাে গভীর হতে পারে না কৌতুক আর চঞ্চলতায় চোখদুটো তার ছলছল করছে সবসময়ে। এই চিঠিটাকে সম্পূর্ণ বুঝবার মতন মন আছে তার হৃদয় আছে? দূরের কলকাতা থেকে একটি নিঃসঙ্গ বিরহী মানুষের কান্না কি তার মনের কাছে কখনাে পৌঁছয় ? এইসব চিঠি পড়বার পর কোনদিন তাে সে দেখিনি সুধা ঘুমভাঙা রাত কাটাচ্ছে জানালার ধারে, কোনদিন চোখে পড়েনি মাঝরাতে জ্যোৎস্নার আলােয় সে পায়চারী করছে বাইরের লনের ভেতর। রাত এগারটা থেকে ভাের পাঁচটা পর্যন্ত সে একটানা নিশ্চিন্তে ঘুমােয়, ঘুম ভাঙ্গলে শােনা যায় গানের গুনগুনানি, তারও পরে কানে আসে তার উজ্জ্বল গলার ডাক এই আয়-আয় চা-টা জুড়িয়ে গেল যে। সুধার কাছে চিঠি পাওয়াটা শুধু অভ্যাস।

যেমন অভ্যাস তার স্কুলের রুটিন, তার গভর্নিং বডির মিটিং। প্রথম প্রথম শ্যামলী নিজেকে জিজ্ঞেস করত। সুধা যা খুশি করুক সে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তা নিয়ে তােমার এত দুর্ভাবনা কেন? কিন্তু ভাবনাটাকে কোনমতেই সরিয়ে দেওয়া যায় না বলেই শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে জবাবদিহির দায় সম্পূর্ণ মিটিয়ে দিয়েছে সে। এখন মধ্যে মধ্যে সুধাকে তার খারাপ লাগে, অসম্ভব খারাপ লাগে। দূরের মানুষটাকে কোনদিন সামনে পেলে শ্যামলী সােজাসুজি প্রশ্ন করে বসত : এমন করে তুমি কেন লেখাে ওকে- ও কি তােমার কথা বুঝতে পারে কখনাে? সুধা ছুটে এল ঘর থেকে শ্যামলী-শ্যামলী। শ্যামলী চোখ তুলল। দারুণ খবর আছে ভাই। ও আসছে। হৃৎপিণ্ডে আবার ঝড়ের মাতন উঠল। শ্যামলী কথা বলতে পারল না। পরশু এসে পড়বে। বিকেলে ট্রেনে। খুশীতে সুধা ঝলমল করতে লাগল ছুটি নিয়েছে দুদিন। আমাকেও ছুটি নিতে হবে শনিবারটা আর রবিবারের মিটিংটাও শেষ পর্যন্ত শ্যামলীর কানে গেল না। তাহলে আমি টীচার্স মেসে-টীচার্স মেসে কেন? তাের স্বামী আসছেন। 

আমি আর এখানে- বাজে বকিসনি। তিনটে ঘর রয়েছে, তুই থাকলে অসুবিধে কিসের? বরং—সুধা অভ্যাস মত এসে শ্যামলীর গলা জড়িয়ে ধরল তুই থাকলে আমার পতিদেবতাটিকে দুটো একটা রান্না করে খাওয়ানাে যাবে। আমাকে তাে জানিস ডাল, আলুসেদ্ধ আর কোনমতে একটা মাছের ঝােল ছাড়া আর কিছু আমি রাঁধতে জানি না। পতিদেবতা কথাটা অদ্ভুত রকমের কুশ্রী ঠেকল কানে। আর গলার পাশে সুধার হাতটা যেন সাপের পাকের মত মনে হল, ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়েও শ্যামলী পারল না। সুধা স্টেশনে গেছে। চাইতে হয়নি, ভালােমানুষ সেক্রেটারী উপযাচক হয়েই পাঠিয়ে দিয়েছেন নিজের গাড়িটা। বলেছেন, মিস্টার মিত্র স্টেশন থেকে রিকশা করে আসবেন তাতে কি আমাদের সম্মান থাকে! 


শ্যামলী বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। সুধার কথা সে জানে না কিন্তু দুটো দিন কিভাবে যে তার কেটেছে! কৌতূহল? নিশ্চয় কৌতূহল। এমন করে যে চিঠি লিখতে পারে কেমন দেখতে সে মানুষটি? সুধার কাছ থেকে তার কোন বিবরণ সে শােনেনি, সে-ই প্রশ্রয় দেয়নি সুধাকে। কিন্তু শ্যামলীর মনের সামনে একটা চেহারা একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ছিপছিপে লম্বা চেহারা। মাথায় কোঁকড়ানাে চুল, গায়ের রঙ ফর্সা নয় খানিকটা স্নিগ্ধ শ্যামল। একটা শান্ত ভীরুতা আছে চরিত্রে যতই আট পাতা ধরে চিঠি লিখুক, স্বভাবে স্বল্পভাষী, একটুখানি লাজুক হাসিতেই অর্ধেক কথার জবাব দেয় সে। সুধার সঙ্গে তার মেলে না একেবারেই না। অথচ বেলা পড়ে আসছে অবসন্ন বিকেল কালাে হয়ে উঠেছে লনের ঘাসের ওপর। হাতের ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখল শ্যামলী। অন্তত আধ ঘণ্টা আগে ট্রেনটা এসে গেছে। স্টেশনে। এত দেরী করছে কেন তবুও ?

মােটরের আওয়াজ কানে এল তখন। একটা অর্থহীন ভয় আর লজ্জায় শ্যামলীর মনে হল, ছুটে ঘরের মধ্যে পালিয়ে যায় সে। কিন্তু গেল না। নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। গাড়িটা এসে দাঁড়াল সামনে। সুধা নেমে এল একাই। মুখ ভার হয়ে আছে তার। শ্যামলীর পাশে এসে ক্লান্ত বিমর্ষ গলায় বললে, এল না রে! ট্রেন চলে যাওয়ার পর ফিরে আসছি, পথে পিয়ন একটা টেলিগ্রাম দিলে। কী কতকগুলাে জরুরি কাজে ব্যাঙ্ক ওকে আটকে দিয়েছে লাস্ট মােমেন্টে। Next Week এ আসতে পারে হয়তাে। রেলিং চেপে ধরে শ্যামলী দাঁড়িয়ে রইল। একটা দুর্বোধ্য যন্ত্রণায় দুটো চোখ যেন তার বন্ধ হয়ে আসছে। কিসের ঘােরে সে এমন করে কাটাল দুটো দিন? সব মিথ্যে সব নিরর্থক হয়ে গেছে। বিকেলের ছায়ার ওপর কোথা থেকে আছড়ে পড়েছে জমাট কালাে একটা অন্ধকারের পিণ্ড আকারহীন একটা জন্তুর মত সেটা গড়িয়ে আসছে। 

শ্যামলীর দিকেই। একটা নিঃশ্বাস ফেলে সুধা বললে, কী হােপলেস লােক। রাগ করে চিঠির জবাব দেব না- তাহলেই পথ পাবে না ছুটে আসতে। মাঝখান থেকে তুই-ই খেটে মরলি, এতরকম খাবার তৈরী করলি ওর জন্যে। মরুকগে ওর বরাতে আছে বাের্ডিংয়ের উচ্ছে-চচ্চড়ি, বসে বসে তা-ই চিবােক, ওগুলাে আমরাই শেষ করে দেব। বলতে বলতে সুধার চোখ পড়ল শ্যামলীর দিকে। যেন এতক্ষণে নজর পড়ল তার। আর তৎক্ষণাৎ নিজের দুঃখ ভুলে গিয়ে তার স্বাভাবিক কৌতুকে সে হেঁসে উঠল। আরে আরে, তুই যে আজ দারুণ সেজে-ছিস! এর আগে তাে এমন কোনদিন দেখিনি! তুই যে কখনাে সেন্ট মাখতে পারিস এ তাে আমার স্বপ্নেও জানা ছিল না সুধা খিল খিল করে হেসে উঠল মনে হচ্ছে, আমার নয় তােরই বর আসছে আজকে। আর বলেই সুধা স্তব্ধ হয়ে গেল। সাদা হয়ে গেছে শ্যামলীর মুখ তাকানাে যাচ্ছে না তার দিকে। তৎক্ষণাৎ অনুতাপে মরমে মরে গেল সুধা। 

রাগ করিসনি ভাই, ঠাট্টা করছিলুম। জানি, এসব ঠাট্টা তাের একেবারে ভাল লাগে না, কিন্তু হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল আমাকে মাপ কর ভাই শ্যামলী, কিন্তু ততক্ষণে শ্যামলীর ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আর বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শ্যামলী ক্লান্ত জন্তুর মত নিঃশ্বাস ফেলছে ঘনঘন, যেন প্রাণপণ শক্তিতে বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছে সে। এক মুহূর্তে সে যেন নগ্ন হয়ে গেছে। সুধার কাছে পৃথিবীর কাছে নিজের কাছে। সুধার একটিমাত্র কথায় সমস্ত আবরণ উড়ে সরে গেছে তার, ভেতরকার সেই সর্বনাশা ভাঙ্গানটার আগুনঝরা চোখে চেয়ে রইল সে। সুধার ফিরতে রাত হল। নিরাশ বিষণ্ণ মনটাকে খানিক সহজ করবার জন্যে সে টিচার্স মেসে আড্ডা দিতে গিয়েছিল। 

বাড়ি ফিরতেই ঝি একটা চিঠি দিলে। শ্যামলীর চিঠি। জরুরী একটা কাজে সন্ধ্যার ট্রেনেই তাকে যেতে হচ্ছে কলকাতায়। সেই সঙ্গে একখানা একমাসের ছুটির দরখাস্ত। Without Pay হলেও ক্ষতি নেই। সমস্ত জিনিসটার একটা অর্থ নিজের মত অনুমান করে নিয়ে যখন অনুতাপে সুধা নিথর হয়ে বসে আছে, তখন অন্ধকার কালাে মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটছে ট্রেনটা। সেই অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা আকারহীন তমসা-পিণ্ডের মত কী যেন গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসছে শ্যামলীর দিকে, আর কয়লার গুঁড়ােয় আচ্ছন্ন অপলক চোখের দৃষ্টি মেলে রেখে শ্যামলী যেন একটু একটু বুঝতে পারছে, কেন তার দ্বিতীয় শরীরটা শিলাবতী পার হয়ে রাত্রির সেই পথটা ধরে এগিয়ে চলেছিল যে পথের কোন শেষ নেই, যে পথ কোনদিন তাকে কোথাও নিয়ে যাবে না।

@👉 Bengali Sad Love Storyগল্পটি পড়ে যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই শেয়ার এবং কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না.....

Post a Comment

Appreciate Your Valuable Feedback. I Hope You Like Post And Subcribe Our Blog. Please DO NOT SPAM - Spam Comments Will Be Deleted Immediately.

Previous Post Next Post