বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী | Vishwakarma Puja Panchali

WhatsApp Channel Follow Now
Telegram Group Follow Now

বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী (Vishwakarma Puja Panchali) : বিশ্বকর্মা পূজা বা বিশ্বকর্মা জয়ন্তী হচ্ছে একটি হিন্দুধর্মীয় উৎসব। হিন্দু স্থাপত্য দেবতা বিশ্বকর্মার সন্তুষ্টি লাভের আশায় এই পূজা করা হয়। তাঁকে বিশ্বের স্রষ্টা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তিনি দেবতা কৃষ্ণের রাজধানী পবিত্র দ্বারকা শহরটি নির্মাণ করেছিলেন।

এছাড়াও তিনি রামায়ণে বর্ণিত লঙ্কা নগরী, পাণ্ডবদের মায়া সভা, রামায়ণে উল্লিখিত ব্রহ্মার পুষ্পক রথ, দেবতাদের বিভিন্ন গমনাগমনের জন্য বিভিন্ন বাহন, দেবপুরী এবং বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, শিব এর ত্রিশূল, কুবের এর অস্ত্র, ইন্দ্রের বজ্র, কার্তিকের শক্তি সহ দেবতাদের জন্য বহু কল্পিত অস্ত্রের স্রষ্টা।

বিশ্বকর্মার ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে তিনি এই বিশ্বের সব কর্মের সম্পাদক। কথিত আছে, পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথমূর্তিও তিনিই নির্মাণ করেন। তাঁকে স্বর্গীয় ছুতারও বলা হয়। তিনি সব ধরনের শিল্পের প্রকাশক। শিল্পবিদ্যায় বিশ্বকর্মার রয়েছে একচ্ছত্র অধিকার। তিনি নিজেই চতুঃষষ্টিকলা, স্থাপত্যবেদ এবং উপবেদ এর প্রকাশক।

বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী | Vishwakarma Puja Panchali

বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী

রাবনের রাজাপ্রসাদের সাথে সুন্দর উদ্যান, গোষ্ঠ, মন্ত্রণা গৃহ, মনোরম ক্রীড়া স্থান, রাজাপ্রাসাদের কারুকার্য ইত্যাদি দেবশিল্পীর নিখুত শিল্প কলার পরিচয় দেয় । এছাড়া ভাগবত পুরান অনুসারে দ্বারকা নগরীর যে সুরক্ষিত, ভাস্কর্য , কলা কৌশলের একটি ধারনা পাওয়া যায়- তাতে শিল্পী বিশ্বকর্মার শিল্প কে দেখে আশ্চর্য হতে হয় ।

বিশ্বকর্মার অপর নির্মাণ হল দেবপুরী । তিনি সমস্ত সৌন্দর্য কে মিলিয়ে এই পুরী নির্মাণ করেছিলেন । এই পুরীকে পাওয়ার জন্য বারংবার অসুর গণ সুর লোকে হানা দিয়েছিলেন। তাই বিশ্বকর্মার সৃষ্টিকে প্রনাম না করে থাকা যায় না ।

মৎস্য পুরান বলে- কি কূপ, কি প্রতিমা, কি গৃহ, কি উদ্যান সকল কিছুর উদ্ভাবক হলেন বিশ্বকর্মা। শুধু এখানেই বিশ্বকর্মার সৃষ্টি শেষ নয়, যে বিমানে চড়ে দেবতারা গমন করেন- তাও বিশ্বকর্মার তৈরী। এবং বিভিন্ন দিব্য বান- যা কেবল দেবতাদের অস্ত্রাগারে থাকে – তাও বিশ্বকর্মার তৈরী।

যে ধনুক দিয়ে ভগবান শিব ত্রিপুরাসুরকে বধ করেছিলেন, যে ধনুক পরশুরামের কাঁধে শোভা পেতো- সেই ধনুক বিশ্বকর্মার সৃষ্টি। বৃত্রাসুর বধের জন্য বিশ্বকর্মা দধীচি মুনির অস্থি থেকে বজ্র নির্মাণ করে দেবেন্দ্র কে দিয়েছিলেন ।

কিছু পুরান বলে ভগবান বিষ্ণুর চক্র, ভগবান শিবের ত্রিশূল বিশ্বকর্মার সৃষ্টি । শ্রী শ্রী চন্ডীতে দেখি মহিষাসুর বধের জন্য দেবী মহামায়া প্রকট হলে দেবীকে তীক্ষ্ণ বর্শা, অভেদ্য কবচ এবং বহু মারনাস্ত্র বিশ্বকর্মা দেবীকে প্রদান করেন । রামচন্দ্রের সেতু বন্ধনের অন্যতম কারিগর নল এই বিশ্বকর্মার পুত্র ।

বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী ব্রতকথা

বিষ্ণু পুরান বলে ত্বষ্টা নামক এক শিল্পী ছিল- যিনি বিশ্বকর্মার পুত্র । দেবতাদের শিল্পী যেমন বিশ্বকর্মা , তেমনি অসুর দের শিল্পী হলেন ময় দানব । বায়ু পুরান ও পদ্ম পুরান মতে ভক্ত প্রহ্লাদের কন্যা বিরোচনার সাথে বিশ্বকর্মার বিবাহ হয় । বিশ্বকর্মার ঔরসে বিরোচোনার গর্ভে অসুর শিল্পী ময় দানবের জন্ম হয় ।

ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরান মতে বিশ্বকর্মা ও তাঁর স্ত্রী ঘৃতাচী দুজনেই শাপ পেয়ে ধরাধামে জন্ম নেন । ঘৃতাচী ছিলেন স্বর্গের এক নর্তকী । তাঁদের নয়টি সন্তান হয় – যথা মালাকার , কর্মকার , কাংস্যকার, শঙ্খকার , সূত্রধর, কুবিন্দক, কুম্ভকার, স্বর্ণকার, চিত্রকর ।

বিশ্বকর্মা প্রত্যেক কেই নানান শিল্প শেখান । তিনি মালাকারকে পুস্প শিল্প, কর্মকারকে লৌহ শিল্প, কাংস্যকারকে কাংস শিল্প, শঙ্খ কারকে শঙ্খ শিল্প, সূত্রধরকে কাষ্ঠ শিল্প, কুবিন্দক কে বয়ন শিল্প, কুম্ভকারকে মৃৎ শিল্প, স্বর্ণকারকে অলঙ্কার শিল্প, চিত্রকরকে অঙ্কন শিল্প শেখান। স্কন্ধ পুরান বলে বৃত্রাসুর হলেন বিশ্বকর্মার পুত্র। যাকে ইন্দ্র দেবতা বধ করেন । তবে স্কন্ধ পুরানের এই মত অপর কোন পুরানে পাওয়া যায় নি ।

এত সর্তেও বলা যায় বিশ্বকর্মার এক মেয়ে পিতার অমতে বিয়ে করেছিল। এই কারনে বিশ্বকর্মা বানর হয়ে পৃথিবীতে জন্মান । ঘটনা টি এই- বিশ্বকর্মা ও ঘৃতাচীর কন্যা চিত্রাঙ্গদা পৃথিবীর সূর্য বংশীয় রাজা সুরথ কে ভালোবাসতো। সুরথও চিত্রঙ্গদা কে ভালোবাসতো ।

কিন্তু দেবতা হয়ে ত মানুষের সাথে বিবাহ হয় না । বিশ্বকর্মা জানতে পেরে মেয়েকে যথেষ্ট শাসন করলেন । এই অবস্থায় পৃথিবীর মেয়েরা যা করে বিশ্বকর্মার কন্যা টিও তাই করলো । স্বর্গ থেকে পালালো । দুজনে বিবাহ করে নিলো। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বিশ্বকর্মা আসলেন ।

কন্যা ভাবলেন পিতা বুঝি আশীর্বাদ করতে এসেছেন । কিন্তু না। বিশ্বকর্মা অভিশাপ দিলেন । কন্যার বিবাহ বিচ্ছেদ হোক – এমন অভিশাপ দিলেন । কিন্তু সনাতন ধর্মে বিবাহকে খুব পবিত্র সম্পর্ক মানা হয়- যেখানে বিবাহ বিচ্ছদের স্থান নেই।

তাই মহর্ষি ঋতধ্বজ ভাবলেন দেবতা হয়ে বিশ্বকর্মার একি পশুর মতো বুদ্ধি? মুনি বিশ্বকর্মা কে বানর কূলে জন্মাবার শাপ দিলেন । বিশ্বকর্মা বানর হলেন । অবশেষে এক সময় কন্যার বিবাহ মেনে নিলে কন্যা ও বিশ্বকর্মা দুজনেরই শাপ দূর হয়।

Vishwakarma Puja Panchali

ভাদ্রমাসের সংক্রান্তির দিন বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়। সূতার-মিস্ত্রিদের মধ্যে এঁর পূজার প্রচলন সর্বাধিক। তবে বাংলাদেশে স্বর্ণকার,কর্মকার এবং দারুশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণও নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বকর্মার পূজা করে থাকেন।

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী বিশ্বকর্মা পূজার দিনটি ‘কন্যা সংক্রান্তি’ তে পড়ে। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী অনুসারে এটি সাধারণত প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যে উদযাপিত হয়। দিনটি ভারতীয় সৌর বর্ষপঞ্জি এবং বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসের শেষ দিন। সৌর ক্যালেন্ডারে ভারতীয় ভাডো মাসের শেষ দিন। বাংলাদেশ, ভারতের আসাম, উত্তরপ্রদেশ, কর্ণাটক, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং ত্রিপুরা রাজ্যে সৌর বর্ষপঞ্জী অনুসারে দিনটি পালিত হয়। প্রতিবেশী দেশ নেপালেও এই উৎসব উদযাপিত হয়।

বিশ্বকর্মার সন্তুষ্টি অর্জন ও তার প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে কেবল প্রকৌশলী কিংবা স্থপতি সম্প্রদায় নয়, সব ধরনের কারিগর, সূতার, মিস্ত্রি, কামার-কুমার, স্বর্ণকার, শিল্প কর্মী, কারখানার শ্রমিক, ঢালাইকর সহ অনেক ধরনের পেশার মানুষ এদিন তাঁর পূজা করে। তারা আরও উন্নত ভবিষ্যতের জন্য, নিরাপদ কাজের পরিস্থিতি এবং নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোপরি নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করে।

আবার শ্রমিকেরা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রার্থনা করে। কখনো কখনো কারিগরেরা এসব যন্ত্রপাতি বিশ্বকর্মার নামে সমর্পন করে এবং ওই সময় সেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বিরত থাকে। আধুনিক ইলেকট্রনিক সার্ভারগুলিও যাতে সুষ্ঠুভাবে কাজ করে সে জন্যও কেউ কেউ তার উপাসনা করে।

বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী : আশাকরি বিশ্বকর্মা পূজার পাঁচালী ব্রতকথা গুলি আপনাদের পূজা করার সময় অনেক উপকারে আসবে। পোষ্টটি আপনার কেমন লাগলো মন্তব্য করে জানাবেন যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না, আরও নতুন নতুন তথ্য পাওয়ার জন্যে আমাদের ওয়েবসাইট টি সাবস্ক্রাইব করতে পারেন নমস্কার।
WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now

Leave a Comment